সৃষ্টি থেকে আজ অবধি পর্ব ১: আল্পসের কোলে এক ভূখণ্ডের জন্ম

সুইজারল্যান্ডের ইতিকথা পর্ব ১

সহিদুল আলম স্বপন
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৬ এএম
আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০২:০১ এএম
Main News Image

ইউরোপের হৃদয়ে অবস্থিত ছোট্ট কিন্তু বিস্ময়কর এক দেশ সুইজারল্যান্ড। আল্পস পর্বতমালার তুষারাবৃত শিখর, নীল হ্রদ, সবুজ উপত্যকা আর শান্ত গ্রামাঞ্চলের জন্য দেশটি যেমন বিখ্যাত, তেমনি তার ইতিহাসও সমানভাবে আকর্ষণীয় ও গভীর। আজকের সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও উন্নত সুইজারল্যান্ড একদিন ছিল বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি উপত্যকা ও উপজাতীয় বসতির সমষ্টি। হাজার হাজার বছরের ইতিহাস পেরিয়ে ধীরে ধীরে এই ভূখণ্ড গড়ে উঠেছে আজকের আধুনিক রাষ্ট্রে।

সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসের সূচনা খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় বহু হাজার বছর আগে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫০০০ বছর আগেই মানুষ এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু করেছিল। আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে এবং বড় বড় হ্রদের আশেপাশে তারা ছোট ছোট গ্রাম গড়ে তোলে। সে সময় মানুষের জীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর শিকার করা, মাছ ধরা এবং প্রাথমিক কৃষিকাজই ছিল জীবিকার প্রধান উপায়।

এই প্রাচীন বসতিগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের নির্মাণ পদ্ধতি। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ হ্রদের পানির উপর কাঠের খুঁটি গেড়ে তার উপর ঘর তৈরি করত। এসব বসতিকে বলা হয় “লেক ডুয়েলিংস” বা হ্রদবাস। সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন হ্রদের তলদেশে আজও সেই কাঠের খুঁটি ও বসতির নিদর্শন পাওয়া যায়। এগুলো আজ ইউনেস্কো ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অংশ।

সময়ের সাথে সাথে এই অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতি এসে বসবাস শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে এখানে প্রধানত কেল্টিক জাতিগোষ্ঠীর বসতি গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও পরিচিত ছিল “হেলভেটি” নামের এক কেল্টিক গোত্র। তারা আল্পসের উপত্যকা ও সমভূমিতে বসবাস করত এবং কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের জীবনধারা গড়ে তোলে।

হেলভেটি জাতি শুধু একটি উপজাতি ছিল না, বরং তারা ছিল সংগঠিত ও শক্তিশালী একটি জনগোষ্ঠী। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক কাঠামো ছিল। তারা কাঠ ও পাথরের দুর্গ নির্মাণ করত এবং নিজেদের অঞ্চল রক্ষা করত। ইউরোপের অন্যান্য কেল্টিক জাতির সঙ্গে তাদের যোগাযোগও ছিল।

এই হেলভেটি জাতির নাম থেকেই পরবর্তীকালে সুইজারল্যান্ডের ল্যাটিন নাম “হেলভেটিয়া” এসেছে। আজও সুইজারল্যান্ডের ডাকটিকিট, মুদ্রা এবং অনেক সরকারি প্রতীকে “Helvetia” নামটি দেখা যায়। এটি মূলত দেশটির প্রাচীন ঐতিহাসিক পরিচয়ের স্মারক।

তবে ইতিহাসের গতিপথ কখনো স্থির থাকে না। ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে এই অঞ্চলও নতুন শক্তির প্রভাবের অধীনে আসে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য রোমান সাম্রাজ্য তার ক্ষমতার বিস্তার শুরু করে। রোমানরা ধীরে ধীরে গল ও আশপাশের অঞ্চল দখল করতে থাকে।

এই সময় হেলভেটি জাতি তাদের পুরনো বসতি ছেড়ে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করে। তারা মনে করেছিল নতুন স্থানে গিয়ে আরও ভালোভাবে বসবাস করা সম্ভব হবে। কিন্তু এই পরিকল্পনা তাদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনে।

খ্রিস্টপূর্ব ৫৮ সালে রোমান সেনাপতি জুলিয়াস সিজার হেলভেটিদের এই অভিবাসন পরিকল্পনা থামিয়ে দেন। তিনি তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান এবং শেষ পর্যন্ত তাদের পরাজিত করেন। এর ফলে হেলভেটি জাতি বাধ্য হয় আবার তাদের পুরনো ভূখণ্ডে ফিরে যেতে।

এই ঘটনাটি শুধু একটি যুদ্ধের ঘটনা ছিল না; এটি সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে এক বড় মোড়। কারণ এর পর থেকেই এই অঞ্চল ধীরে ধীরে রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাবের অধীনে চলে আসে।

(সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি)