আমেরিকার জীবনধারা (পর্ব – ২)
এখানে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। তবে বাস্তবতা সরল বিশ্বাসের মতো এতটা সহজ নয়। উন্নত প্রযুক্তি, উচ্চ মজুরি এবং নাগরিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশ্র চিত্র এখানে ভিন্ন রূপ ধারণ করে। জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যন্ত বেশি। এখানেও গৃহহীন মানুষ রয়েছে, যাদের ‘হোমলেস’ বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য নিজস্ব আইন দ্বারা পরিচালিত। এখানে চিকিৎসা ব্যয় মোটেও বিনামূল্যে নয়; বরং ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর মাঝামাঝি এক জটিল কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ। ভুল চিকিৎসা এখানেও ঘটে কখনও কখনও তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে এ কারণে হাসপাতাল ভাঙচুর বা চিকিৎসকদের ওপর শারীরিক হামলার ঘটনা সাধারণত দেখা যায় না।
ট্রাফিক জ্যামও একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় দুই থেকে তিন মাইল পর্যন্ত যানজট তৈরি হয়, ফলে দূরপাল্লার ভ্রমণ সবসময় স্বস্তিদায়ক নয়। বিশ্বের ভয়াবহ যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় নিউইয়র্কের নামও রয়েছে। এখানেও সড়ক মেরামতের কাজ চলমান থাকে একদিকে শেষ না হতেই অন্যদিকে শুরু হয়।
নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস বা ব্রুকলিনের কিছু এলাকায় দিনের বেলাতেও মানুষ যেতে ভয় পায়; ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে। বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ হিসেবে আইসল্যান্ড শীর্ষে থাকলেও নিরাপত্তার বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক নিচে।
আমেরিকা একটি বহুজাতিক ও বহুসংস্কৃতির দেশ। এখানে বাংলাদেশিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভাষা আয়ত্ত করা এবং মূলধারার সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। জীবনযাত্রা এখানে সহজ নয়; কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই সাফল্য অর্জন করতে হয়। আধুনিক জীবনের সব সুবিধা থাকলেও তার জন্য উচ্চ মূল্য দিতে হয়।
ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মজুরি তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। এখনও প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। অনেক আমেরিকান ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন হোক তা ক্রেডিট কার্ড কিংবা ব্যাংক ঋণ। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য প্রচলিত আর্থিক কৌশল সবসময় কার্যকর হয় না।
এই দেশে আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য কিছুটা সৃজনশীল হতে হয়। যেমন মর্টগেজ রিফাইন্যান্স করা, জ্বালানি সাশ্রয়ী জীবনযাপন, ব্যবহৃত গাড়ি ব্যবহার, খাদ্যের অপচয় কমানো ইত্যাদি। এসব পরিকল্পনা স্বনির্ভর হতে সহায়তা করে। তবে কেবল সাশ্রয়ী হলেই যথেষ্ট নয়; অনেকেরই দ্বিতীয় আয়ের উৎস তৈরি করতে হয়, যাকে এখানে ‘সেকেন্ড জব’ বলা হয়।
বাংলাদেশি অভিবাসীরা এ দেশে আসার সময় কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন। এর মধ্যে পারিবারিক সহিংসতা (যেমন স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানের প্রতি শাসনের নামে শারীরিক নির্যাতন) একটি গুরুতর সমস্যা। এছাড়া অনেকেই খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে আসেন, কিন্তু তারা জানেন না যে বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনেকে আবার পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়া কাপড়চোপড় নিয়ে আসেন, যা স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই হয় না। অথচ যে অঞ্চলে বসবাস করতে যাবেন, সেখানকার আবহাওয়া সম্পর্কে জেনে তবেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
চলবে…
(পর্ব – ১)
https://dhakaherald.net/travel/heritage-and-antiquities/tourism-and-aviation/news/45
(লেখক: শরীফুল আলম: বোর্ড মেম্বার, পিভিসি কন্টেইনার করপোরেশন ইএসএ, কলামিস্ট ও কবি, নিউইয়র্ক, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। ইমেইল: shariful.alam.faruk@gmail.com)