আমেরিকার জীবনধারা (পর্ব – ১)

শরীফুল আলম, নিউইয়র্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:১৩ পিএম
আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫০ এএম
Main News Image

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে বাঙালিদের এই দেশে আগমন শুরু হয়। আমিও ১৯৯৮ সালের ২৩ নভেম্বর এই দেশে পা রাখি।

যান্ত্রিক পাখিটির (বিমান) ভেতরে বসে আমি আনমনে ছিলাম। হঠাৎ সেটি নড়েচড়ে সচল হয়ে উঠল। মাটির বুক চিরে তীক্ষ্ণ শব্দে গতি বাড়াতে লাগল ক্রমশ দ্রুত, আরও দ্রুত। জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় সেটি আকাশে উড়াল দিল। বাতাস চিরে শিস দিতে দিতে কখনও উপরে উঠছে, আবার নিচে নামছে সময়ের সঙ্গে গন্তব্যও এগিয়ে আসছে। মনে তখন এক ধরনের অনিশ্চয়তার আশঙ্কা কাজ করছিল।

একপর্যায়ে বিমানটি বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবতরণ করে। সেখানে প্রায় চার ঘণ্টা অবস্থান করার পর পুনরায় আট ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাই। তখন নভেম্বর মাস প্রচণ্ড শীত। আগে থেকে জানানো বন্ধু নুরু বাইরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে খুব বেশি সময় লাগেনি। সে অ্যাস্টোরিয়ায় একটি দুই কক্ষের বাসায় পরিবারসহ বসবাস করত।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশিরা মূলত দুইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে শুরু করে- 

১) গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে

২) শিপ জাম্পার হিসেবে

গ্রিন কার্ডধারীদের মধ্যেও কেউ ওপেন ভিসা বা ডিভি (ডাইভার্সিটি ভিসা) নিয়ে আসেন। অন্যদিকে শিপ জাম্পারদের অধিকাংশই নোয়াখালী ও সন্দ্বীপ অঞ্চলের ছিলেন। তারাই মূলত নিউইয়র্কের ব্রুকলিন এলাকায় প্রথম বসতি গড়ে তোলেন।

বর্তমানে নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, কানেকটিকাট, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং মিশিগানসহ বিভিন্ন শহরে বাঙালিদের বসবাস বেশি দেখা যায়। তারা সাধারণত দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও মতাদর্শগত ভিন্নতার কারণে ঐক্যবদ্ধ নয়; ফলে তারা নানা ভাগে বিভক্ত। এই দেশে বাঙালিরা অসংখ্য সংগঠন ও সমিতি গড়ে তুলেছে।

একসময় বন্যার স্রোতের মতো বাংলাদেশিদের আগমন বাড়তে থাকে। তখন নিউইয়র্কের অ্যাস্টোরিয়া এলাকায় মূলত ক্যারিবীয় কৃষ্ণাঙ্গদের বসবাস ছিল। তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত নয় এবং স্থায়ী কর্মসংস্থানে যুক্ত নয়; সরকারি বিভিন্ন সহায়তার উপর নির্ভরশীল। মাঝে মধ্যে তারা সহিংস আচরণও করত। ফলে বিশেষ করে রাতে মেট্রোতে চলাচল অনেকের জন্য ভীতিকর ছিল।

আশির দশকের পর থেকে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, অ্যাস্টোরিয়া, ব্রুকলিন, চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড এভিনিউ এবং জামাইকা এলাকায় বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করে।

আমেরিকায় আমার প্রথম কর্মদিবসের অভিজ্ঞতা আজও মনে পড়ে। আমার মালিক ছিলেন একজন চীনা নারী তার একটি আইসক্রিমের দোকান ছিল। প্রথম দিনেই তিনি আমাকে একটি ঝাড়ু দিয়ে পুরো দোকান পরিষ্কার করতে বললেন। মনে মনে ভাবলাম, আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত মানুষ, আর তুমি মালিক!

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের লোয়ার ইস্ট সাইডের চায়না টাউনে দোকানটির অবস্থান ছিল। খাঁটি চীনা খাবার ও সুলভ মূল্যে কেনাকাটার জন্য এলাকাটি খুবই পরিচিত। সেখানে প্যাগোডা এবং ফুটপাতের বিক্রেতাদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। এখানকার চীনারা প্রধানত ফুঝৌ ভাষায় কথা বলে। তাদের দ্রুত বর্ধনশীল কমিউনিটি বিশেষ করে ব্রুকলিন ও ফ্লাশিং এলাকায় বেশি দেখা যায়।

সেই দিন থেকেই শুরু হলো জীবনের কঠিন সংগ্রাম। গৃহস্থালির নানা কাজ, দোকানের কাজ, ড্রাইভিং সবকিছুই আমাকে করতে হয়েছে।

চলবে…

(লেখক: শরীফুল আলম: বোর্ড মেম্বার, পিভিসি কন্টেইনার করপোরেশন ইএসএ, কলামিস্ট ও কবি, নিউইয়র্ক, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। ইমেইল: shariful.alam.faruk@gmail.com)