ফাইনালে মুখোমুখি গুরু-শিষ্য
নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ ফাইনাল। তবে আগামী রোববারের এই ম্যাচটি কেবল আর্জেন্টিনা ও স্পেনের শিরোপা লড়াই নয়; ফুটবলপ্রেমীরা প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছেন এক অনন্য দ্বৈরথ—গুরু বনাম শিষ্যের লড়াই। স্পেনের ডাগআউটে যখন কৌশলের জাল বুনবেন ৬৫ বছর বয়সী লুইস ডি লা ফুয়েন্তে, তখন আর্জেন্টিনার ডাগআউট থেকে তার জবাব দেবেন ৪৮ বছর বয়সী লিওনেল স্কালোনি।
নয় বছর আগে, ২০১৭ সালে মাদ্রিদের উপকণ্ঠের লাস রোসাসে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রো কোচিং লাইসেন্সের কোর্স করছিলেন সাবেক পেশাদার ফুটবলার লিওনেল স্কালোনি। কোচিং ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখা সেই তরুণ স্কালোনির শিক্ষক ছিলেন আর কেউ নন, স্বয়ং লুইস ডি লা ফুয়েন্তে। সময়ের আবর্তনে সেই শিক্ষক ও ছাত্র আজ আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম সফল দুই মাস্টারমাইন্ড হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ডি লা ফুয়েন্তের ক্লাসে কোচিং শেখার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, ২০১৮ সালের আগস্টে প্রথমে অন্তর্বর্তীকালীন ভিত্তিতে আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেন স্কালোনি। সাবেক দেপোর্তিভো লা করুনা খেলোয়াড় স্কালোনি আলবিসেলেস্তেদের দায়িত্ব নিয়ে দলটিকে নিয়ে গেছেন সাফল্যের এক স্বর্ণযুগে:
২০২১: কোপা আমেরিকা জয় (যার মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের বড় শিরোপা খরার অবসান ঘটে)।
২০২২: কাতার বিশ্বকাপ জয় (ফুটবলের সর্বোচ্চ সাফল্য)।
২০২৪: আরও একটি কোপা আমেরিকার শিরোপা জয়।
অন্যদিকে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে শেষ ষোলো থেকে হতাশাজনক বিদায়ের পর স্পেনের কোচের দায়িত্ব পান ডি লা ফুয়েন্তে। তার অধীনে ‘লা রোহা’ ফিরে পায় তাদের চিরচেনা ছন্দ এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষ সারিতে নিজেদের স্থান পুনর্প্রতিষ্ঠিত করে:
মঙ্গলবার ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে স্পেনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ডি লা ফুয়েন্তেকে এখন ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের একেবারে দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
বুধবার সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করার পর স্কালোনি তাঁর প্রাক্তন গুরু সম্পর্কে গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করে বলেন:
"তিনি ছিলেন আমার পরামর্শদাতা। আমি যা জানি, তার সবই তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। আর এখন আমরা একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছি। কাতার বিশ্বকাপের পর কোচদের একটি সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল। তিনি তাঁর দল নিয়ে অসাধারণ কাজ করেছেন। তাঁর জন্য আমি সত্যিই আনন্দিত।"
খেলোয়াড়ি জীবনের বেশির ভাগ সময় স্পেনে কাটানো স্কালোনির দেশটির সঙ্গে ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্কও বেশ গভীর। তাঁর স্ত্রী এলিসা মনতেরো স্প্যানিশ এবং দুই ছেলেকে নিয়ে তাঁদের বসবাস মায়োর্কায়। তবে মাঠের লড়াইয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি নন তিনি:
"সবাই জানে আমি স্পেনে থাকি এবং আমার পরিবার স্প্যানিশ। তারপরও আমি ডি লা ফুয়েন্তেকে হারানোরই চেষ্টা করব। তিনি মাঠে দল পরিচালনার ধরন এবং একজন মানুষ হিসেবে—দুই দিক থেকেই আমার সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেছেন।"
অন্যদিকে, শিষ্যকে নিয়ে গর্বিত শিক্ষক ডি লা ফুয়েন্তেও প্রশংসায় ভাসিয়েছেন স্কালোনিকে:
"লিওনেলের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে সে সবকিছু জিতেছে। তার অনেক চিন্তাধারার সঙ্গে আমি একমত। লিওনেল খুবই পরিশ্রমী ছাত্র ছিল। শেখার প্রতি তার দারুণ আগ্রহ এবং ইতিবাচক মনোভাব ছিল। তার শিক্ষক হতে পারাটা আমার জন্য সম্মানের। তবে সবকিছুর আগে সে আমার বন্ধু। আমাদের মধ্যে এখনো দারুণ সম্পর্ক রয়েছে।"
রোববারের ফাইনালটি তাই কেবল ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, এটি হতে যাচ্ছে ফুটবলীয় কৌশল, পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর গুরু-শিষ্যের এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান। বিশ্বমঞ্চের এই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবেন—গুরু নাকি শিষ্য? তার উত্তর মিলবে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায়।