বিশ্বকাপে স্পেনের মুকুট : বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য একটি নতুন প্রশ্নপত্র

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম
আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৩২ এএম
Main News Image

বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে, কিন্তু আলোচনা শেষ হয়নি। বরং বলা যায়, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে শুধু স্পেনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য নয়; বরং ফুটবল, রাজনীতি, প্রযুক্তি, বিতর্ক এবং নতুন ফুটবল শক্তির উত্থান সবকিছুর এক বিস্ময়কর মিশ্রণের জন্য। ফাইনালে স্পেন ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে, আর একই সঙ্গে শেষ হয়েছে উত্তর আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব। 

এই বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, ফুটবল আর শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এটি এখন বৈশ্বিক কূটনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনমতেরও লড়াই।

সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি টেলিফোন কলকে ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন লাল কার্ড দেখে পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ হন। এরপর ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানান, তিনি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন। পরে ফিফার স্বাধীন শৃঙ্খলা কমিটি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করলে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন ওঠে রাজনীতি কি ফুটবলের বিচারব্যবস্থায় প্রভাব ফেলেছে? ট্রাম্প দাবি করেন তিনি কেবল পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন; কিন্তু ইউরোপীয় ফুটবল মহল, বিশেষ করে উয়েফা, এটিকে ফুটবলের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক নজির হিসেবে দেখেছে। 

ফাইনালের ট্রফি প্রদান অনুষ্ঠানেও সেই বিতর্কের রেশ ছিল। ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো মাঠে নামতেই দর্শকদের একাংশের দুয়োধ্বনি শোনা যায়। ফুটবলপ্রেমীরা যেন বার্তা দিতে চেয়েছিলেন মাঠের সিদ্ধান্ত মাঠেই থাকুক। 

তবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো এসেছে তথাকথিত ছোট দেশগুলোর কাছ থেকে। কেপ ভার্দে শেষ ষোলোতে পৌঁছে আর্জেন্টিনাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চাপে রেখেছিল। কুরাসাও নিজেদের গ্রুপে জার্মানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিশ্বকে দেখিয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থাকলে জনসংখ্যা নয়, ফুটবল দর্শনই আসল শক্তি। নরওয়ে, মরক্কো, প্যারাগুয়ে এদের পারফরম্যান্সও প্রমাণ করেছে, ফুটবলের মানচিত্র বদলে যাচ্ছে। আজ আর শুধু ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি বা ফ্রান্সের যুগ নয়; নতুন শক্তির উত্থান বাস্তবতা।

আর এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা। বাড়ির ছাদে বিশাল পতাকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক, পাড়া-মহল্লায় উৎসব এ দৃশ্য পৃথিবীর আর কোথাও এত তীব্রভাবে দেখা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এখনও শুধু অন্য দেশের ফুটবলের দর্শক হয়েই থাকব?

যখন স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, বাংলাদেশে কেউ আনন্দ করে, কেউ কাঁদে। অথচ বাংলাদেশের নিজের ফুটবল কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাকাতে হবে বাংলাদেশের নতুন ফুটবল পরিকল্পনার দিকে। প্রধান কোচ টমাস ডুলির অধীনে জাতীয় দল নতুনভাবে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কৌশল নয়; বরং মানসিকতা বদলানো। বাংলাদেশকে এমন এক সংস্কৃতি গড়তে হবে যেখানে বিশ্বকাপের সময় শুধু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা নয়, বাংলাদেশের পতাকাও সমান গর্বে ওড়ে।

ডুলির সামনে কাজ সহজ নয়। ঘরোয়া লিগের মান, বয়সভিত্তিক ফুটবল, অবকাঠামো, স্পোর্টস সায়েন্স, পুষ্টি, স্কাউটিং সবখানেই উন্নতির প্রয়োজন। কিন্তু কেপ ভার্দে, মরক্কো কিংবা কুরাসাও যদি বিশ্বকে চমকে দিতে পারে, তাহলে ১৮ কোটির বাংলাদেশ কেন অন্তত এশিয়ার শক্তিশালী দল হতে পারবে না?

বিশ্বকাপ ২০২৬ আমাদের আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে। আধুনিক ফুটবলে অর্থ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পরিকল্পনা তার চেয়েও বড়। ছোট দেশগুলো পরিকল্পনা করেছে; আমরা এখনও আবেগে আটকে আছি।

বাংলাদেশের সমর্থকদের আবেগ পৃথিবীর সেরা। এখন দরকার সেই আবেগকে বাংলাদেশের ফুটবলের শক্তিতে রূপান্তর করা।

বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। ট্রফি স্পেন নিয়ে গেছে। বিতর্ক ইতিহাসে লেখা থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও উত্তরহীন, আমরা কি আগামী বিশ্বকাপেও শুধু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে থাকব, নাকি একদিন বাংলাদেশকেও বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখার স্বপ্নকে বাস্তব করার পথে হাঁটব?

সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ।

লেখক : বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি।