অ্যান্টিবায়োটিকঃ ঔষধ না বিষ

জসীম মোহাইমেন
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম
আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৪ পিএম
Main News Image

শিরোনাম দেখে অনেকেরই হয়তো চোখ কপালে উঠতে পারে এই ভেবে যে, জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক আবার বিষ হয় কিভাবে! ব্যাপারটা দিনের আলোর মতোই পরিস্কার-অ্যান্টিবায়োটিক আমদের জীবন রক্ষার জন্য মহা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও শুধুমাত্র ভুল ব্যবহার বা প্রয়োগের অসাবধানতায় এটা আমদের জীবনের যবনীকা পাত করার জন্য যথেষ্ঠ কারণ হতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক কি

অ্যান্টিবায়োটিক এক ধরনের জৈব-রাসায়নিক উপাদান যা মাইক্রো অর্গানিজম বা অণুজীবদের বিশেষ করে ব্যাক্টেরিয়া বিনাশ করে বা বৃদ্ধিরোধ করে। সাধারানতঃ একেক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক একেক ধরনের প্রক্রিয়ায় অন্যান্য অণুজীবের বিরুদ্ধে কাজ করে। বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়া ও ছত্রাক অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করে। "অ্যান্টিবায়োটিক" সাধারণভাবে ব্যাক্টেরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার হয়, ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না।

আবিষ্কার

বিশ্বখ্যাত স্কটিশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯২৭ সালে লন্ডনের সেন্ট মেরি হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় প্রথম আন্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন। ফ্লেমিং গবেষনাগারে পরীক্ষারত সময় লক্ষ্য করেন, জমাট আবাদ মাধ্যমে (Solid culture medium) ছত্রাকের উপস্থিতিতে স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস নামক ব্যাক্টেরিয়া জন্মাতে পারেনা। যদিও ফ্লেমিং এর পরীক্ষায় আবাদ মাধ্যমে ছত্রাকের উপস্থিতি কাম্য ছিল না, তবে পরীক্ষাকালীন কোনো অজানা ত্রুটির কারণে ছত্রাক আবাদ মাধ্যমে চলে এসে ছিল। ফ্লেমিং তখন ঐ ছত্রাকের প্রজাতি চিহ্নিত করতে ও তার জীবাণু নাশক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতের আগ্রহী হন। ছত্রাকটি ছিল পেনিসিলিয়াম ,তাই তিনি পেনিসিলিয়াম দ্বারা নিসৃত ঐ পদার্থের নাম দেন পেনিসিলিন ।

এবার আসি জীবন রক্ষাকারী এই মহা গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি কেন এবং কিভাবে আমাদের জন্য আশীর্বাদ কিংবা অভিশাপ বয়ে আনে। আসলে কোন অ্যান্টিবায়োটিক যখন সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক নিয়মে ব্যবহৃত হয় তখন এটা আমাদের জীবন রক্ষায় অপরিসীম ভূমিকা পালন করে ।আর যখন অপরিকল্পিত ভাবে কিংবা সঠিক প্রেসক্রিপশন না মেনে ব্যবহার করা হয় তখন এই অ্যান্টিবায়োটিকই জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, তখন ঐ অ্যান্টিবায়োটিকটি যে জীবাণু ধ্বংস করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং আস্তে আস্তে রেজিস্ট্যান্ট বা প্রতিরোধ্য হয়ে যায়। অর্থ্যাৎ ঐ অ্যান্টিবায়োটিকটি তখন আর ঐ নির্দিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে না।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হলো এমন একটি অবস্থা যা সংগঠিত হয়, যখন কতিপয় ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে। এরা অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে অভিযোজিত হয়ে যায় এবং নিজেদের স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে উঠতে ও বংশবিস্তার করতে পারে ফলে মানুষ বা পশুর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। আগে যে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে তাদের রোগ সেরে যেত, এখন আর সেই অ্যান্টিবায়োটিকে তা সারে না বরং ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাছাড়া এসব রোগাক্রান্ত মানুষ বা পশু অন্য কারো উপস্থিতিতে হাঁচি-কাশি প্রভৃতির মাধ্যমে তাদের শরীরের আভ্যন্তরীণ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দেয় এবং তারাও একই রকম দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কেন বাড়ছে?

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স একটি বিশাল বড় চিন্তার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কেননা সময়ের সাথে সাথে ব্যাকটেরিয়াদের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা লাভের প্রবণতা কমছে না, বরং হু হু করে বেড়ে চলেছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো সাম্প্রতিক সময়ে অত্যধিক মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার। সামান্য কোনো অসুখ হলেই মানুষ অ্যান্টিবায়োটিকের দিকে ঝুঁকছে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ব্যতিক্রমী দুই-এক ক্ষেত্রে রোগীর দেহে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া থেকে যাচ্ছে যাদের উপর অ্যান্টিবায়োটিক কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। এদিকে তারা অ্যান্টিবায়োটিকের সান্নিধ্যে আসার মাধ্যমে, অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল শিখে ফেলছে, এবং পরবর্তীতে তাদের মাধ্যমে সৃষ্ট নতুন ব্যাকটেরিয়ার মধ্যেও একই গুণাগুণ দেখা দিচ্ছে। এভাবে তারা নিজ হোস্টের (যার শরীরে বাসা বেঁধেছে) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তো কমিয়ে দিচ্ছেই, পাশাপাশি সেই হোস্ট অন্যদের কাছে গেলে, অন্যদের শরীরেও তারা ঢুকে পড়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে একজনের শরীরে এক প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা লাভ করলে, পরবর্তীতে সেটি অন্য আরো অনেকের শরীরেও সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

তাই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা একনকার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।অ্যান্টিবায়োটিক সচেতনাতাই পারে আমাদেরকে এই ভবিষ্যৎ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে। অতএব, এ সম্পর্কে কিছু বিষয়ে জেনে রাখা আমদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। যেমনঃ

১. সাধারনত আমাদের সবারই কমঅবেশী জ্বর হয়।মনে রাখবেন জ্বর কোন রোগ নয় এটি একটি উপসর্গ। জ্বরের জন্য শুরুতেই এন্টিবায়োটিক খাবেন না। প্যারাসিটামল বিপি ৫০০ এমজি. ট্যাবলেট খেতে পারেন, জ্বরের মাত্রা ১০৩-১০৪ ডিগ্রী ফারেনহাইট থাকলে প্যারাসিটামল সাপোজিটরি নিতে পারেন। ৫-৬ দিনের মাঝে জ্বর সেরে না গেলে ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন। কিন্ত শুরুতেই ডাক্তারকে এন্টিবায়োটিক দিতে অনুরোধ বা জোর করবেন না। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবারা প্রায়ই এমনটা করেন। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে জ্বর হয়েছে—এমন প্রমাণ হাতে পাওয়ার আগে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করবেন না।

২. অনেকের অনেক ধরনের এন্টিবায়োটিকের প্রতি সংবেদনশীলতা থাকে। একই অ্যান্টিবায়োটিক একজনের জন্য প্রাণ রক্ষাকারী; আরেকজনের জন্য প্রাণসংহারীও হতে পারে। কোনো ওষুধে অ্যালার্জি থাকলে তা অবশ্যই চিকিৎসককে জানাতে হবে। ওষুধ সেবন শুরু করার পর ত্বকে র‌্যাশ, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। প্রয়োজনে ওষুধ বন্ধও করে দিতে পারেন।

৩.অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হলে অবশ্যই অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে অন্যথায় মারাত্মক বিপদ হতে পারে। বাচ্চার নানা ধরনের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই চিকিৎসককে নিজের শারীরিক অবস্থা জানানো জরুরি।

৪. অনেক ওষুধের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রিয়া হতে পারে। যেমন এন্টিবায়োটিক, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির কার্যকারীতায় প্রভাব ফেলে। এর ব্যবহারে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির আশানুরূপ কার্যক্রম নাও পেতে পারেন। তাই আপনি বর্তমানে কোন ঔষধ সেবন করছেন তা চিকিৎসককে জানাতে হবে।

৫. ওষুধ কত ঘণ্টা পরপর মোট কত দিন খেতে হবে, তা ভালোমতো জেনে নিন। ঠিক সেই সময় ধরেই ওষুধ খেতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে সাধারণত দিনে তিনবার বা চারবারের বদলে আট বা ছয় ঘণ্টা পরপর ওষুধ খেতে বলা হয়। কোনো একটা ডোজ খেতে ভুলে গেলে পরবর্তী ডোজ কিন্তু বেশি খাওয়া যাবে না। এ বিষয়ে সতর্কতা জরুরী।

৬. অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্স শেষ হওয়ার আগেই শরীর ভালো লাগতে পারে। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হয়ে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বন্ধ করা যাবে না। পুরো কোর্সটি শেষ করতে হবে। না হলে জীবাণু পুরোপুরি ধ্বংস নাও হতে পারে।

৭. অন্য কেউ কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে গলাব্যথা সারিয়েছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে কখনো অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না। আবার আগে যে অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে কাশি সেরেছে, সেটি আবার খেলে সেরে যাবে, এমন ধারণা ভুল। আগেরবারের রয়ে যাওয়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াও ভালো কথা নয়।

৮. শিশুদের ওজন অনুসারে অ্যান্টিবায়োটিক মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। একই বয়সী আলাদা ওজনের দুই শিশুর অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স দুই রকম হতে পারে। না বুঝে-শুনে বা ধারণা করে তাই শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না। মাত্রা ভালো করে জেনে নিন। পুরোনো মুখ খোলা অ্যান্টিবায়োটিক সিরাপ বা সাসপেনশন আবার ব্যবহার করবেন না। সাসপেনশন তৈরির সঠিক নিয়ম জেনে নিন।

৯. চিকিৎসকের কাছে অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জেনে নিতে হবে। কোনো অ্যান্টিবায়োটিকে প্রস্রাবের রং লাল হয়ে যায়, কোনোটাতে আবার পেটে গ্যাস হয়। কোনটা খেলে রুচি কমতে পারে বা বমি পেতে পারে। জানা থাকলে ভালো। এতে করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরবর্তী আপনার দুশ্চিন্তা হ্রাস পাবে।

১০. কোন কোন অ্যান্টিবায়োটিক খেলে বেশি করে পানি পান করতে হয়। কোন কোন অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে কিছু খাবার বা অ্যালকোহল বিক্রিয়া করে। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক আছে, যা কিডনি বা যকৃতের সমস্যায় সেবন করা যায় না। তাই নিজের শরীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য দিয়ে চিকিৎসককে সাহায্য করতে হবে।

১১. এন্টিবায়োটিক কখনোই খালি পেটে খাওয়া যাবে না।

শেষ কথা

মানুষ ও পশুর দ্রুত রোগমুক্তি ও গড় আয়ু বৃদ্ধিতে অ্যান্টিবায়োটিকের অবদানের শেষ নেই। কিন্তু কথায় আছে না, লেবু বেশি কচলালে তেতো হয়ে যায়, অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রেও ঠিক যেন তেমনটাই হচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অপেক্ষাকৃত দ্রুত রোগমুক্তি ঘটে বটে, কিন্তু তাই বলে এর যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদেরকে খুবই ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। সামান্য একটু অসুস্থ হলেই আজকাল আমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠি, চিকিৎসককে বলে অ্যান্টিবায়োটিক নিই।অনেকে তো আবার চিকিৎসকের তোয়াক্কা না করে নিজেরাই ফার্মেসিতে গিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে আনি। এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের শরীরটাকে এমন বানিয়ে ফেলছি যে, অন্যান্য সমস্যা তো আছেই, এমনকি আমাদের শরীর অতি সাধারণ কোনো ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও একা একা লড়াইয়ের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এভাবে নিজেদের অজান্তেই আমরা অ্যান্টিবায়োটিক-পরবর্তী যুগের দিকে এগিয়ে চলেছি। যখন অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না তখন নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস, স্ট্রেপ থ্রোট, টিউবারকুলোসিস, লাইম ডিজিজ, কানে পচন কিংবা দেহত্বকে ঘায়ের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে আবারো মানুষ প্রাণ হারাতে শুরু করবে। অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত ও যথেচ্ছ ব্যবহারে যদি লাগাম না টানি, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় কঠিন সময়ের মোকাবেলা করতে হবে।

লেখক: জসীম মোহাইমেন, প্রোডাকশন ম্যানেজার, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিঃ। মেইল: mohaiminul@inceptapharma.com