গাজার ধ্বংসস্তূপের ছাদে নতুন জীবন
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা এখন মৃত্যুর নীরবতা আর ধসে পড়া কংক্রিটের এক বিশাল স্তূপ। চারপাশে পোড়া দেয়াল, বোমার ক্ষত আর স্বজনহারানো মানুষের আর্তচিৎকার। কিন্তু এই ভয়াবহ তাণ্ডবের মাঝেও গাজার বাতাসে ভেসে আসছে এক পরিচিত শব্দ—‘ভনভন’। বারুদের তীব্র গন্ধের তোয়াক্কা না করে ধ্বংসস্তূপের মাঝে ফোটা বুনো ফুলের খোঁজে ডানা মেলছে মৌমাছির ঝাঁক।
যুদ্ধের ধ্বংসলীলা কেড়ে নিয়েছে গাজার ঐতিহ্যবাহী জলপাই বন, কমলার বাগান আর সবুজ প্রান্তর। তবে প্রকৃতির এই খুদে ‘পরাগবাহক’ মৌমাছিদের টিকে থাকা প্রমাণ করে—মৃত্যুর নগরীতেও কোথাও না কোথাও এখনো ফুল ফুটছে।
গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকায় ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ভবনের ছাদে দেখা মেলে জীবনের এই অদ্ভুত লড়াইয়ের। সেখানে সারি সারি মৌচাক বসিয়েছেন ৪৯ বছর বয়সী মৌচাষি ইব্রাহিম নাজি আল-দাব্বা। সাত সন্তানের জনক ইব্রাহিম যুদ্ধের কারণে বারবার বাস্তুচ্যুত হয়ে শেষমেশ আশ্রয় নিয়েছেন এই বিধ্বস্ত ভবনে।
গাজা মৌচাষি সমবায় সমিতির সভাপতি ইব্রাহিম নাজি আল-দাব্বা বলেছেন, "মৌমাছির জন্য গাছ আর সবুজ পরিবেশ লাগে। অথচ আমরা আজ ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মৌমাছি পালন করছি।"
ইব্রাহিমের জীবনের সঙ্গে মৌচাষ জড়িয়ে আছে বংশপরম্পরায়। যুদ্ধের আগে পূর্ব গাজায় তাঁর ৪০০টিরও বেশি আধুনিক মৌচাকের বাক্স ও সংগ্রহশালা ছিল, যার আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখ ডলার। যুদ্ধে সব হারিয়ে নিঃস্ব হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। জমানো সঞ্চয়ের প্রায় ৩ হাজার ডলার দিয়ে মাত্র ৩টি মৌ-কলোনি কিনে নতুন করে যাত্রা শুরু করেন। ছেলেদের সহযোগিতায় সেই ৩টি বাক্স থেকে আজ গড়ে উঠেছে ৩৫টি মৌচাক।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নির্ধারিত সীমারেখা বা ‘ইয়েলো লাইন’-এর কারণে গাজার সিংহভাগ কৃষিজমিতে এখন মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। মৌমাছিরা অবশ্য এই ভৌগোলিক ও সামরিক সীমানা বোঝে না; তারা ঠিকই সীমান্ত ডিঙিয়ে ফুলের ঘ্রাণ শুকে মধু সংগ্রহ করে ফিরে আসছে ছাদের চাকে।
গাজার অন্য মৌচাষিরাও এখন আর মধু বিক্রির কথা ভাবছেন না, তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হলো মৌমাছিদের বাঁচিয়ে রাখা, কৃত্রিম খাবার: ফুল না থাকায় ত্রাণের চিনি গুলে কৃত্রিম খাবার বানিয়ে মৌমাছিদের দেওয়া হচ্ছে। মধ্য গাজার নুসেইরাত ক্যাম্পের ৩২ বছর বয়সী মৌচাষি ফাহাদ আল-দাহদুহ ধ্বংসস্তূপ থেকে কাঠের টুকরো ও ভাঙা বাক্স কুড়িয়ে এনে হাতুড়ি-পেরেক দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে নতুন বাক্স বানাচ্ছেন।
কৃষি প্রকৌশলীদের মতে, এই খুদে পতঙ্গগুলো না থাকলে উদ্ভিদ ও পরিবেশের স্বাভাবিক বিকাশ থেমে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসভ্যতার জন্যই হুমকি। গাজার মানুষ ও মৌমাছিদের জীবনের গল্পটা এখন একই সূত্রে গাঁথা। বারুদ আর ধ্বংসের মাঝেও মৌমাছি যেমন ফুলের খোঁজে উড়ে চলে, ঠিক তেমনই বারবার সর্বস্ব হারিয়েও গাজার মানুষ বুক বাঁধে নতুন করে বেঁচে থাকার আশায়। মৌমাছির ডানা ঝাপটানোর শব্দ যেন পোড়া গাজাকে নীরবে বার্তা দিয়ে যায়—“সবুজ আবার ফিরবে, জীবন আবার জাগবে।”