বিশ্ববাজারে লাফিয়ে বেড়েছে তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ এখন চরমে।
এদিকে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের উত্থান নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে। ফলে বিশ্বখ্যাত চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দরপতন অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) নীতিগত সিদ্ধান্তের দিকে সতর্ক নজর রাখছেন। বাজারে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সুদের হার কমানোর পরিবর্তে ফেড হয়তো কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও তেলের বাজার : মঙ্গলবার ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথ যুদ্ধবিমান হামলা চালায়। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এসব গোষ্ঠী সম্প্রতি দুই ডজনের বেশি ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরান-সমর্থিত যে সশস্ত্র গোষ্ঠী মার্কিন সেনা ও সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার চেষ্টা করছিল, তাদের লক্ষ্য করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে মার্কিন বাহিনী তেহরানের একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করে।
সংঘাতের পারদ আরও চড়ে বুধবার, যখন ইরান হরমুজ প্রণালীতে তিনটি তেলবাহী জাহাজ আটকের ঘোষণা দেয়। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দুই সপ্তাহের টানা পাল্টাপাল্টি হামলার পর তিন দিনের একটি বিরতি চলছিল। সেই বিরতি ভেঙে নতুন করে হামলা ও জাহাজ আটকের ঘটনায় তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।
বুধবার প্রধান দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। জুলাইয়ের শুরুতে ব্যারেলপ্রতি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার। গত সপ্তাহে তা বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যদিও তিন দিনের বিরতির সময় দাম কিছুটা কমেছিল, কিন্তু নতুন ঘটনায় তা আবার চড়াও হলো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনার কথা বললেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ওই অঞ্চলের ভঙ্গুর পরিস্থিতির কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
প্রযুক্তি খাত ও শেয়ারবাজারে ধাক্কা : জ্বালানির অস্থিরতার পাশাপাশি বিশ্ব শেয়ারবাজারে বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রযুক্তি খাত। এআই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হলেও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা আসবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন জাগছে।
প্রযুক্তিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'দ্য ইনফরমেশন'-এর এক প্রতিবেদন বাজারকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের একটি প্রতিষ্ঠান (সাংহাই ইউলিয়াংশেং) চিপ তৈরির নতুন এক প্রযুক্তির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। এতদিন এই প্রযুক্তিতে নেদারল্যান্ডসের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এএসএমএলের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। চীনের এই অগ্রগতি বিশ্ব বাজারে চিপ বিক্রির সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
এই প্রভাবে এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির কসপি (KOSPI) সূচক ৬ শতাংশের বেশি কমে গেছে। চিপ মেকার স্যামসাংয়ের শেয়ার ৬ শতাংশ এবং এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ১০ শতাংশ কমেছে।
বিশেষ করে এনভিডিয়ার মেমোরি চিপ সরবরাহকারী এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম এক মাস আগের রেকর্ড অবস্থান থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ পড়ে গেছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও পরিচালন মুনাফা প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা বিমুখ হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও প্রযুক্তি খাতের অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন এক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।