ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের ঘোষণা: কূটনীতির সুযোগ নাকি অস্ত্রের ঘাটতি?
ইরানের ওপর আকস্মিকভাবে বিমান ও সামরিক হামলা স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর পথ তৈরি করতেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আক্রমণ স্থগিতের এ নির্দেশনা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন টানা দুই রাত আক্রমণ বন্ধ রাখায় তেহরানও তাদের ‘প্রতিশোধমূলক’ পাল্টা হামলা স্থগিত রেখেছে। তবে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, কোনো কূটনৈতিক কৌশল নয়—মূলত ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্রাগারের তীব্র ঘাটতির কারণে সামরিক চাপের মুখে পড়ে সাময়িকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন ট্রাম্প।
ওয়াশিংটনের দাবি, কূটনীতিকে সুযোগ দেওয়া জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ সম্প্রতি মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনীতিকে আরেকটি সুযোগ দিচ্ছেন, যাতে শান্তি আলোচনাকে আবারও কার্যকরভাবে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায়।"
সংবাদমাধ্যম এনবিসি-কে দেওয়া অন্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ট্রাম্প আপাতত পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করলেও সকল সামরিক বিকল্প খোলা রাখছেন। ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ একটি এআই (AI) নির্মিত ছবি প্রকাশ করেছেন, যেখানে ইরানি জাহাজ ও খার্গ দ্বীপে মার্কিন সামরিক বিমানকে বোমা ফেলতে দেখা যায়।
গণমাধ্যমের দাবি, অস্ত্রাগারে 'বিপজ্জনক ঘাটতি' মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আগেই সতর্ক করেছিলেন। তারা জানান, ইরানে একের পর এক হামলা এবং মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তা বজায় রাখতে গিয়ে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ও নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ 'বিপজ্জনক মাত্রায়' নেমে এসেছে। এছাড়া, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের ক্রমাগত ড্রোন হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। এসব কৌশলগত সংকটের কারণেই ট্রাম্পের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত।
তবে রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ গণমাধ্যমের এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "সামরিক অভিযানটি সফলভাবে পরিচালনা করার জন্য মার্কিন বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় সকল সরঞ্জাম মজুদ রয়েছে।"
তেহরান তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে 'হামলার জবাবেই কেবল হামলা'। যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ বন্ধ করার পর ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানিয়েছেন, তেহরান কেবল আত্মরক্ষার নীতিতে অটল রয়েছে। তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র গত দুই রাতে যেহেতু হামলা বন্ধ রেখেছে, সে কারণে আমরাও আমাদের সামরিক অভিযান স্থগিত করেছি। আমাদের কৌশল কেবল 'হামলার জবাবে পাল্টা হামলা'।"
আকরামিনিয়া আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং ওয়াশিংটনের স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৪০ দিনব্যাপী যুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং জুন মাসে দুই পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই করে।তবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। গত ১৩ই জুলাই মার্কিন সামরিক বাহিনী পুনরায় বিমান হামলা চালায় এবং বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও রকেট হামলা বাড়ায় ইরান, যাতে অন্তত চারজন মার্কিন সেনা নিহত হন। দুই পক্ষই হামলা বন্ধ রাখায় কূটনীতিক অঙ্গনে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সাময়িক স্থিতিশীল হয়েছে। সংঘাত এড়িয়ে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তেহরানে ইরান ও ওমানের মধ্যে 'কারিগরি বৈঠক' অনুষ্ঠিত হলেও হরমুজ প্রণালির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়া এখনও বাকি।