২৩ সেমি লম্বা লেজ মানুষের! চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বরেকর্ড

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম
আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২৯ এএম
Main News Image

২৩ সেমি লম্বা লেজ মানুষের! চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বরেকর্ড

কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প বা পৌরাণিক কাহিনি নয়, খোদ কলকাতার বুকে ঘটে গেল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন ঘটনা। উত্তরবঙ্গের এক ১৩ বছরের কিশোরের পিঠ থেকে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বাদ দেওয়া হলো আস্ত একটি লেজ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় 'ট্রু হিউম্যান টেল’ (True Human Tail)।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারিত মানব লেজের ইতিহাসে ২৩ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এই লেজটিই এ যাবৎকালের বিশ্বের দীর্ঘতম লেজের উদাহরণ! পিঠের এই ভারী বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে কিশোরটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু কেন এই ঘটনা বিশ্ব চিকিৎসাজগতে তোলপাড় ফেলে দিল? দেখে নেওয়া যাক বিস্তারিত।

বিশ্বরেকর্ড ভাঙল তিলোত্তমা: চিকিৎসাজগতে অনন্য নজির : কলকাতার এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ সব্যসাচী বক্সী এবং তাঁর বিশেষজ্ঞ টিমের হাত ধরে এই গৌরবময় নজিরটি গড়ল তিলোত্তমা।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোর পাতা ওল্টালে দেখা যায়:

সিউডো টেল (Pseudo Tail): মেরুদণ্ডের ত্রুটি বা টিউমারের কারণে মানবদেহে লেজের মতো অংশ গজানোর এই ঘটনা এ পর্যন্ত প্রায় ২০০টি নথিভুক্ত হয়েছে।

ট্রু হিউম্যান টেল (True Human Tail): কোনো হাড় বা টিউমার ছাড়া, স্রেফ নরম কলা ও পেশি দিয়ে তৈরি প্রকৃত মানব লেজের অস্ত্রোপচার বিশ্ব ইতিহাসে ঘটেছে মাত্র ৪০টি। এসএসকেএম হাসপাতালের এই কেসটি হলো পৃথিবীর ৪১তম ঘটনা।

পূর্বের রেকর্ড বনাম বর্তমান রেকর্ড: এর আগে ভারতের দীর্ঘতম রেকর্ড ছিল মহারাষ্ট্রের নাগপুরে এক ১৭ বছরের কিশোরের ১৮ সেন্টিমিটারের লেজ। আন্তর্জাতিক স্তরে ফ্রান্সে এ যাবৎকালের দীর্ঘতম রেকর্ড ছিল ২২ সেন্টিমিটারের একটি লেজ কাটার ঘটনা। এবার ২৩ সেন্টিমিটার লম্বা লেজ সফলভাবে বাদ দিয়ে বিশ্ব চিকিৎসায় এক নম্বরে জায়গা করে নিল কলকাতা।

দৈর্ঘ্যের দিক থেকে অবশ্য আলিপুরদুয়ারের চন্দ্রে ওরামের লেজটি (৩৩.০২ সেন্টিমিটার) গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে রয়েছে। তবে পেশায় ট্রি-প্ল্যান্টেশনের শ্রমিক চন্দ্রে ওরাম ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কখনও অস্ত্রোপচার করাননি। তাই সফল অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা সংক্রান্ত নথির (Medical Documentation) দিক থেকে এসএসকেএম-এর এই কেসটিই এখন বিশ্বের বৃহত্তম।

ট্রু টেল বনাম সিউডো টেল: আসল তফাত কোথায়? : অধ্যাপক ডা. সব্যসাচী বক্সীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের এই লেজ সদৃশ অংশকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়-১. ট্রু হিউম্যান টেল (True Human Tail): এটিই প্রকৃত মানব লেজ। এতে কোনো হাড় বা তরুণাস্থি (Bone Component) থাকে না। এটি মূলত পেশী (Muscle), চর্বি (Fat), ত্বক (Skin), রক্তনালী এবং স্নায়ু দিয়ে গঠিত। যেহেতু এতে সক্রিয় স্নায়ু থাকে, তাই এই অংশে স্পর্শ বা ব্যথার অনুভূতি পাওয়া যায়। এটি শরীরের একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ স্কিন অ্যাপেনডেস (Skin Appendage)। তবে প্রাণীদের মতো মানুষ এটিকে নিজের ইচ্ছায় নাড়াতে পারে না।

২. সিউডো টেল (Pseudo Tail): এটি কোনো প্রকৃত লেজ নয়, বরং অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। সাধারণত মেরুদণ্ডের জন্মগত ত্রুটি (Spinal Dysraphism), যেমন—মেরুদণ্ডের হাড় ঠিকমতো না জোড়া লাগা, কোনো টিউমার বা ক্যানসার (Teratoma), অথবা সুষুম্নাকাণ্ডের জন্মগত ত্রুটি (Tethered Cord Syndrome)-র কারণে পিঠের নিচে লেজের মতো মাংসপিণ্ড ঝুলে থাকতে পারে।

অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি ও জটিলতা : সিউডো টেল হোক বা ট্রু টেল—পিঠের নিচের এই ধরনের অস্ত্রোপচার অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং বেশ জটিল। কোনো রকম নিখুঁত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া একে সাধারণ মাংসপিণ্ড মনে করে কেটে ফেললে স্নায়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে শিশুর চিরতরে পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই অত্যন্ত অভিজ্ঞ নিউরোসার্জন ও সার্জারি বিশেষজ্ঞদের টিম ছাড়া এই অপারেশন করা অসম্ভব। পিজি (SSKM) হাসপাতালে ঠিক এই কঠিন চ্যালেঞ্জটিই সফলভাবে জয় করা হয়েছে।

কেন মানুষের শরীরে গজায় এই লেজ? বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা : অনেকে একে অলৌকিক বা দৈব কিছু ভাবলেও, ডা. বক্সী জানান, এটি আসলে একটি অত্যন্ত বিরল জন্মগত ত্রুটি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গর্ভধারণ ও ভ্রূণতত্ত্বের (Embryology) ইতিহাস জানাচ্ছে, মায়ের জরায়ুর ভেতরে ভ্রূণ বড় হওয়ার সময় আমাদের প্রত্যেকের শরীরেই একটি লেজ সদৃশ অংশ তৈরি হয়, যার মধ্যে প্রায় ১০-১২টি হাড়ের অংশ এবং নরম টিস্যুও থাকে।

প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মে, গর্ভের ৮ম সপ্তাহের মধ্যে মানবদেহের ‘অ্যাপোপটোসিস’ (Apoptosis) বা ‘প্রোগ্রামড সেল ডেথ’ (কোষের আত্মহনন) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই লেজটি নিজে থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং শরীরের সাথে সম্পূর্ণ মিশে যায়। ফলে সাধারণত নবজাতক শিশুরা লেজ ছাড়াই জন্মায়।

কোনো কারণে যদি প্রাকৃতিকভাবে লেজ বিলুপ্তির এই নিয়মটি বা বিবর্তনের চাকা ঘুরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়, তখনই শিশুটি জরায়ুর সেই আদি লেজটি নিয়েই পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়।

জেনেটিক কারণ ও পরিসংখ্যান : গবেষণায় দেখা গেছে, মানবদেহে WNT3A নামক একটি জিন রয়েছে, যা ভ্রূণ অবস্থায় শরীরের পেছনের অংশের গঠনে এবং কোষের বৃদ্ধিতে সংকেত পাঠায়। যদি এই জিনের অতিরিক্ত সক্রিয়তা (Up-regulation) ঘটে, তবে তা শরীরের পেছনের অংশে এই ধরনের অতিরিক্ত অঙ্গ বা লেজ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। পরিসংখ্যান বলছে, এই সমস্যাটি মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায় (অনুপাত প্রায় ২:১)।

বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি ও বর্তমান পরিস্থিতি : অস্ত্রোপচারের পর কিশোরটির শরীর থেকে বাদ দেওয়া লেজটি বর্তমানে বায়োপসির জন্য পাঠানো হয়েছে। আনন্দের কথা হলো, অস্ত্রোপচারের মাত্র একদিনের মধ্যেই কিশোরটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। চিকিৎসকরা আশ্বস্ত করেছেন যে, ভবিষ্যতে তার আর কোনো শারীরিক সমস্যা হবে না এবং এই লেজ পুনরায় ফিরে আসার (Recurrence) কোনো সম্ভাবনাই নেই।

বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই অনন্য নজিরটি খুব শীঘ্রই আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড ইনডেক্সড জার্নালে (International Peer-Reviewed Indexed Journal) বিরল কেস হিস্ট্রি হিসেবে প্রকাশিত হতে চলেছে। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকদের বার্তা: মেরুদণ্ডের নিচে বা শরীরের কোথাও এই ধরনের কোনো অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখলে চুপচাপ বসে থাকবেন না বা কোনো কুসংস্কার-অন্ধবিশ্বাসে কান দেবেন না। সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নজরে আনলে যেকোনো জটিল সমস্যারই এখন আধুনিক ও সফল সমাধান সম্ভব।