শব্দের ক্ষমতা

শরীফুল আলম
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৫ পিএম
আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম
Main News Image

মানুষ সবচেয়ে বেশি কার প্রেমে পড়ে, জানেন? কথার। শব্দের। অভিব্যক্তির। গলার স্বরের। মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত আকর্ষণ। একটি মধুর বাক্য যেমন মুহূর্তেই কারও মন জয় করে নিতে পারে, তেমনি একটি কঠোর শব্দ সারাজীবনের ক্ষতও তৈরি করতে পারে। চুম্বনের শব্দের কথাই ধরুন, শুনতে না চাইলেও তা কানে এসে পৌঁছায়; যেন নিশির নীরব ডাক। শব্দের এই বিস্ময়কর শক্তি মানুষকে যেমন ভেঙে দিতে পারে, তেমনি তাকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্নও দেখাতে পারে। তবে শুধু পাথর ছুড়ে জল ঘোলা করলেই চলে না; জলের গভীরে নেমে তার শীতলতা অনুভব করতে হয়। তেমনি শব্দের প্রকৃত শক্তি উপলব্ধি করতে হলে তার গভীরতায় প্রবেশ করতে হয়।

মানুষের শেষ আশ্রয় তার মুখের ভাষা। মানুষের পরিচয়, শিক্ষা, রুচি, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রকাশ ঘটে তার কথায়। ছোট ছোট অনেক কথার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অশেষ আনন্দ, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও আন্তরিকতা। আবার কখনো সেই কথাই হয়ে ওঠে ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব কিংবা সম্পর্ক ভাঙনের কারণ।

আমাদের সমাজে একটি মজার বৈপরীত্যও দেখা যায়। পুরুষ যখন কথার নেতৃত্ব দেয়, অনেকেই সেটিকে নিয়ন্ত্রণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। আবার নারী যখন দৃঢ়তার সঙ্গে মত প্রকাশ করেন বা নেতৃত্ব দেন, তখন সেটিকে বলা হয় ক্ষমতায়ন। আসলে নেতৃত্বের মূল্যায়ন হওয়া উচিত ব্যক্তি বা লিঙ্গ দিয়ে নয়; হওয়া উচিত প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে।

সবার ব্যস্ততা আমার ভালো লাগে না। তবে হরিণের ছুটে চলা কিংবা ফড়িংয়ের উড়ে বেড়ানোর ব্যস্ততায় আমি এক নির্মল সৌন্দর্য খুঁজে পাই। তেমনি একজন ভালো সঙ্গী বা প্রকৃত বন্ধুর সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারাও জীবনের অন্যতম বড় আনন্দ। এমন একজন বন্ধু থাকলে একটি দ্বিপ্রহরও যেন থমকে দাঁড়ায়; সময় তখন আর সময় থাকে না, হয়ে ওঠে অনুভূতির আরেক নাম।

কথার গুরুত্ব নিয়ে জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎসে একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন, “বিয়ের আগে আরেকবার ভাবো, যাকে তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছ, তার সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলে আমৃত্যু জীবন কাটাতে পারবে তো?” এই একটি বাক্যের মধ্যেই দাম্পত্য জীবনের অন্যতম বড় সত্য নিহিত রয়েছে। সম্পর্কের স্থায়িত্ব কেবল ভালোবাসার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া এবং সুন্দর কথোপকথনের ওপর।

ভালো কথা বলাও এক ধরনের অভ্যাস। আর অভ্যাস যখন অনভ্যাসে পরিণত হয়, তখনই শুরু হয় দূরত্ব, নীরবতা ও সম্পর্কের অবক্ষয়। মানুষ অনেক সময় রাগ ভুলে যায়, কষ্ট ভুলে যায়; কিন্তু অপমানজনক একটি বাক্য বহু বছর ধরে তার হৃদয়ে রয়ে যায়। তাই সুন্দর ভাষার চর্চা কেবল ভদ্রতার পরিচয় নয়, এটি মানবিকতারও অন্যতম প্রকাশ।

পদার্থবিদ্যার জগতে ড. কেন্ট কুলার্স ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। জন্মান্ধ হয়েও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সম্পূর্ণ অন্ধ ব্যক্তি হিসেবে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি নাসার ‘সার্চ ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স (SETI)’ কর্মসূচি এবং SETI Institute-এ গবেষক হিসেবে কাজ করেন। মহাকাশের গভীর থেকে আসা অতি ক্ষীণ রেডিও সংকেত শনাক্ত করার জন্য তিনি উন্নত কম্পিউটার অ্যালগরিদম তৈরি করেছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের সীমাবদ্ধতা নয়, অধ্যবসায়, মেধা ও জ্ঞানের শক্তিই তাকে অসাধারণ করে তোলে। শব্দ তা মানুষের কণ্ঠের হোক কিংবা মহাকাশ থেকে ভেসে আসা সংকেতের জ্ঞান অর্জন ও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

তাই শব্দকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। শব্দ দিয়ে ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগানো যায়, হতাশ মানুষকে নতুন স্বপ্ন দেখানো যায়, একটি পরিবারকে একসূত্রে বাঁধা যায়, এমনকি একটি জাতিকেও ঐক্যবদ্ধ করা যায়। আবার একটি অসতর্ক, নিষ্ঠুর কিংবা অবিবেচক শব্দই ভেঙে দিতে পারে সম্পর্ক, নষ্ট করতে পারে বিশ্বাস, এমনকি ধ্বংস করে দিতে পারে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ।

শব্দের শক্তি তাই অস্ত্রের শক্তির চেয়েও গভীর। অস্ত্র শরীরকে আঘাত করে, কিন্তু শব্দ আঘাত করে মানুষের মন, স্মৃতি ও আত্মাকে। সেই কারণেই আমাদের প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের আগে একবার ভাবা উচিত। কারণ, বলা কথা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না; কিন্তু সেই কথার প্রতিধ্বনি মানুষের হৃদয়ে অনেক দিন, কখনো কখনো সারাজীবন বেঁচে থাকে।

এই সংস্করণটি ভাষা, শৈলী ও তথ্যগত দিক থেকে সংবাদপত্রের সাহিত্যপাতা বা মতামত কলামে প্রকাশের উপযোগী। শুধু একটি বিষয় লক্ষণীয় ফ্রিডরিখ নিৎসের উদ্ধৃতিটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি ভাবানুবাদ; এটি তাঁর মূল জার্মান উক্তির আক্ষরিক অনুবাদ নয়। প্রকাশের ক্ষেত্রে চাইলে উদ্ধৃতিটি ভাবানুবাদ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

লেখক: কলামিস্ট, সংবাদ বিশ্লেষক ও কবি। বোর্ড মেম্বার, পিভিসি কন্টেইনার কর্পোরেশন ইউএসএ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র