পৃথিবীর ফুসফুসে ফিরছে প্রাণ
পৃথিবীর বৃহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅরণ্য অ্যামাজন নিয়ে এক স্বস্তিদায়ক বার্তা দিয়েছে পরিবেশ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ম্যাপবায়োমাস’ (MapBiomas)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্রাজিলের অ্যামাজন রেইনফরেস্টে দাবানলের ব্যাপকতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-তে প্রকাশিত এই তথ্য জলবায়ু সংকটের মাঝেও পরিবেশবিদদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ম্যাপবায়োমাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দাবানলের পরিসংখ্যানে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে, ২০২৪ সালে যেখানে অ্যামাজনের রেকর্ড ১৫৮ লাখ হেক্টর বনভূমি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে তা বহুগুণ কমে নেমে এসেছে মাত্র ৩১ লক্ষ হেক্টরে।
৪১ বছরের রেকর্ড: ১৯৮৫ সালে অ্যামাজন অঞ্চলের তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর থেকে বিগত ৪১ বছরের ইতিহাসে এটিই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সর্বনিম্ন পরিমাণ।
সমগ্র ব্রাজিলের চিত্র: শুধু অ্যামাজন নয়, পুরো ব্রাজিল জুড়েই দাবানলের হার কমেছে। ২০২৪ সালে সারাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০০ লক্ষ হেক্টর বনাঞ্চলের জায়গায় ২০২৫ সালে পুড়েছে ১২৭ লক্ষ হেক্টর।
প্রাকৃতিক প্রভাব ও সতর্কতা : পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এই অগ্নিকাণ্ড হ্রাসের পেছনে আবহাওয়ার ধরণ পরিবর্তনকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন:
'লা নিনা'-র প্রভাব: অত্যন্ত উষ্ণ ও শুষ্ক পরিবেশ সৃষ্টিকারী 'এল নিনো' (El Niño)-র প্রভাব শেষ হয়ে শীতল আবহাওয়ার 'লা নিনা' (La Niña) পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের প্রাদুর্ভাব অনেকটা কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: ম্যাপবায়োমাসের গবেষক ভেরা আরুদা জানান, ৪১ বছরের মধ্যে এটি একটি দারুণ অর্জন হলেও এখনই গা ছাড়া ভাব দেওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে পুনরায় 'এল নিনো' ফিরে এলে শুষ্ক মরসুম দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং দাবানলের ঝুঁকি আবার বাড়তে পারে।
গবেষক (ম্যাপবায়োমাস) ভেরা আরুদা বলেছেন, “৪১ বছরের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা সর্বনিম্ন হওয়াটা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে এই সাময়িক স্বস্তির কারণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে পিছিয়ে আসা যাবে না।”
রাজনৈতিক প্রভাব ও সংরক্ষণ নীতি : আগামী অক্টোবরে ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চার বছর আগে ক্ষমতায় আসার সময় প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা অ্যামাজনকে রক্ষা এবং ‘জিরো ডিফরেস্টেশন’ (শূন্য বন উজাড়) নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
বোলসোনারো বনাম লুলা: সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর আমলে বন উজাড়ের পরিমাণ প্রায় ৭৫% বেড়ে গিয়েছিল। লুলার আমলে দাবানল হ্রাস পাওয়ার এই খবরটিকে তাঁর নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রচারণায় বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের উদ্বেগ: যদিও পরিবেশবিদরা এই সাফল্যকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবুও অ্যামাজন নদীর মোহনায় খনিজ তেল উত্তোলনে লুলা সরকারের অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করছেন অনেকেই।
বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণে প্রকৃতির ফুসফুসখ্যাত অ্যামাজনের অবদান অপরিসীম। ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে সঠিক পদক্ষেপ এবং আবহাওয়ার অনুকূল পরিস্থিতি বনাঞ্চল রক্ষায় কতটা সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বিশ্ব পরিবেশ সুরক্ষার প্রধান লক্ষ্য।