ওষুধের অপচয় ও পরিবেশদূষণ রুখবে ‘স্মার্ট সেন্সর’

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম
আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম
Main News Image

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ওষুধ নষ্ট হয়। কিছু ওষুধ অব্যবহৃত থেকে যায়, আর কিছু ফেলে দেওয়া হয় সাধারণ বর্জ্য বা নর্দমায়—যা মিশে যাচ্ছে মাটি ও নদীতে। এই মারাত্মক অপচয় ও পরিবেশগত হুমকি মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি নিয়ে এসেছেন গবেষকরা। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতার ‘টেকনো ইন্টারন্যাশনাল নিউ টাউন’-এর যৌথ গবেষণায় তৈরি হয়েছে একটি স্মার্ট প্যাকেজিং সেন্সর, যার নাম ‘স্পারাস’ (SPaRAS - Smart Packaging and Returns Assessment System)। আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা জার্নাল ‘নেচার’ গ্রুপে এই গবেষণাটি প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়েছে।

ওষুধ ফেলে দেওয়ার ভয়াবহ প্রভাব : যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS)-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর কেবল ফার্মেসিতে ফেরত আসার পর নষ্ট করা হয় প্রায় ১১ কোটি পাউন্ড মূল্যের ওষুধ। এ ছাড়া বাসাবাড়িতে কেনা ওষুধের প্রায় অর্ধেকই শেষ পর্যন্ত অব্যবহৃত থেকে যায়।

এসব ওষুধ নর্দমা ও আবর্জনায় ফেলার ফলে এর সক্রিয় উপাদান (API) নদী ও পানীয় জলে মিশে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় যুক্তরাজ্যের থেমস নদীর পানিতেও এই রাসায়নিকের উপস্থিতি মিলেছে, যা জলজ প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রজনন ও আচরণ ব্যাহত করছে।

‘স্পারাস’ (SPaRAS) সেন্সর কীভাবে কাজ করবে? : ওষুধের প্যাকেটের ভেতরে থাকা একটি ক্ষুদ্র সেন্সরের মাধ্যমে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পরিমাপ: প্যাকেটের ভেতরের আবহাওয়া ও তাপমাত্রা সঠিক সীমায় ছিল কি না, সেন্সরটি প্রতিনিয়ত তা মেপে তথ্য সংরক্ষণ করে।

প্যাকেট না খুলে তথ্য যাচাই: এতে ব্যবহৃত হয়েছে নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন (NFC) প্রযুক্তি (যা টাচলেস পেমেন্টে ব্যবহৃত হয়)। ফলে ফার্মেসিতে ওষুধ ফেরত আসার পর প্যাকেট না খুলেই স্ক্যান করে মুহূর্তের মধ্যে সব তথ্য জেনে নেওয়া যাবে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাস্তব পরিস্থিতিতে সেন্সরটির তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিমাপ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নির্ভুল।

দীর্ঘমেয়াদী ব্যাটারি ও বিশাল তথ্য ভাণ্ডার : সাধারণ ব্যবহারে সেন্সরটি ফ্ল্যাশ মেমোরিতে ৯৭ হাজারের বেশি তথ্য জমা রাখতে পারে। এনএইচএস (NHS)-এর নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১০ মিনিটে একবার তথ্য সংগ্রহ করলেও ডিভাইসটি দীর্ঘ সময় সচল থাকে। গবেষকদের মতে, সার্কিটের বিদ্যুৎ খরচ কিছুটা কমালে একটি সাধারণ ব্যাটারিতেই সেন্সরটি প্রায় ৩৩৭ দিন পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারবে, যা একটি ওষুধের মেয়াদকালের জন্য যথেষ্ট।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বহু দেশে ফেরত আসা ওষুধ আইনত পুনর্ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। তবে ‘স্পারাস’-এর মতো নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি নীতিনির্ধারকদের আশ্বস্ত করতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির সাথে ব্লকচেইন যুক্ত করে নকল ওষুধ প্রতিরোধ করার পরিকল্পনা করছেন গবেষকরা। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখের বদলে পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ওষুধের ‘পরিবর্তনশীল মেয়াদ’ (Dynamic Expiry Date) নির্ধারণেও এটি বড় ভূমিকা রাখবে। বাস্তব ফার্মেসি পরিবেশে সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হলে এই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ওষুধ অপচয় ও পরিবেশ দূষণ কমাতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।