গভীর রাতে হাওড়া ব্রিজে শুটিং: বিজয় সেতুপতির ৭ মিনিট ও অধরা সাই পল্লবী

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৩:২৫ এএম
Main News Image

রাত তখন প্রায় আড়াইটা। হাওড়া ব্রিজ পুরো ফাঁকা নয়; একের পর এক লরি আর দূরপাল্লার বাস ছুটে চলেছে। শহরের এক অংশ ঘুমে মগ্ন, কিন্তু কলকাতার সবচেয়ে পরিচিত এই সেতুটি তখন ব্যস্ত। সেই ব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ রাস্তার এক পাশ ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হলো। বিশাল রেন মেশিনে ভিজতে শুরু করল ব্রিজের পিচ। শনিবার রাতে কলকাতায় বৃষ্টি ছিল না, কিন্তু পরিচালক মণি রত্নমের নতুন সিনেমার দৃশ্যে বৃষ্টি চাই। তাই রাতভর চলল কৃত্রিম বর্ষণ।

ক্যামেরা বের করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কেউ মোবাইল বা ক্যামেরা বের করলেই বাউন্সার ও নিরাপত্তাকর্মীরা এসে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। কখনো শরীর দিয়ে, কখনো হাত উঁচিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন ফ্রেম। তবু কৌতূহল থামে না। সংবাদের মতো সিনেমার শুটিংও কখন যে কী গল্প উপহার হিসেবে সামনে নিয়ে আসে, তা আগে থেকে বলা মুশকিল।

মহড়া ও প্রস্তুতি : প্রথমে ডামি শিল্পীদের নিয়ে রিহার্সাল। কে কোথায় দাঁড়াবেন, কতটা হাঁটবেন, ক্যামেরা কোন কোণ থেকে দৃশ্য ধারণ করবে—সবকিছু ঠিক করতে একই দৃশ্যের মহড়া হলো চার-পাঁচবার। রেন মেশিন চলছে, আলোর মেজাজ বদলাচ্ছে, ক্যামেরার লেন্স পরিবর্তন হচ্ছে। দর্শক হয়তো প্রেক্ষাগৃহে এই দৃশ্য দেখবেন মাত্র দুই মিনিট, কিন্তু সেই দুই মিনিটের পেছনের প্রস্তুতি কত ঘণ্টার, তা শুটিং স্পটে না দেখলে বোঝা দায়।

রিহার্সাল শেষ হতেই একটি সাদা ইনোভা গাড়ি এসে থামল। নেমে এলেন ছবির নায়ক বিজয় সেতুপতি। পরনে কালো টি-শার্ট আর নীল জিন্স।

একদম পাশে এসে দাঁড়ালেন। অথচ প্রথম দর্শনে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনিই সেই অভিনেতা, যাকে পুরো দেশ এখন 'মহারাজা' নামে চেনে। কোনো তারকা সুলভ দূরত্ব নেই, কোনো বাড়তি হাঁকডাক নেই। খুব সাধারণ কণ্ঠে অনুরোধ করলেন, "দয়া করে ছবি তুলবেন না, আমি সিনেমার লুকে আছি।"

বিজয়ের সাথে সাত মিনিটের সংলাপ :এরপর শুরু হলো সাত মিনিটের এক সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতা। সাংবাদিকতায় সাত মিনিট খুব বড় সময় নয়, কিন্তু কখনো কখনো এই অল্প সময়ই একজন অভিনেতাকে অন্যভাবে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

কলকাতায় এটি বিজয়ের দ্বিতীয় সফর। এর আগে ২০১৭ সালে পরিচালক সি. প্রেম কুমারের ‘৯৬’ সিনেমার শুটিংয়ে এসেছিলেন। শহরের কথা উঠতেই বললেন, "কলকাতার এখনো একটি নিজস্ব ঐতিহ্য ও চিরায়ত রূপ রয়েছে। সেই ক্লাসিক আমেজটা যেন হারিয়ে না যায়।"

কথা বলতে বলতে একটি কালীমন্দিরের প্রসঙ্গ তুললেন। বললেন, "ব্রিজের কাছেই একটা কালীমন্দির আছে না?" তাকে জানানো হলো, তিনি হয়তো বালি ব্রিজের কথা বলছেন। শুনেই হেসে বললেন, "হ্যাঁ, ঠিক..."

সেখান থেকে কথা গড়াল সত্যজিৎ রায়ের দিকে। বিজয় জানালেন, অভিনয় জীবনের শুরুতে যখন তিনি থিয়েটার করতেন, তখনই প্রথম দেখেছিলেন 'পথের পাঁচালী'।

দক্ষিণী সিনেমার সাফল্য ও বলিউডের পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সহজ উত্তর দিলেন, "এখন প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রিই নিজের মাটি, নিজস্ব সংস্কৃতি আর নিজের মানুষের গল্প বলতে চাইছে। শুধু বলিউড নয়, হলিউডসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।"

দক্ষিণ ভারতীয়রা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যে গর্ববোধ করেন, অন্যান্য অঞ্চল কি সেখানে কিছুটা পিছিয়ে? প্রশ্নটি শেষ হতে না হতেই তিনি মাথা নাড়লেন—"একদমই না। মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব থাকাটা খুব স্বাভাবিক। আমার বিশ্বাস, বাঙালিরাও নিজেদের ভাষাকে যথেষ্ট সম্মান করেন।"

চরিত্রের প্রয়োজনে বিজয় নিজের গ্ল্যামার বা শরীরের গড়ন ভেঙে ফেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে হেসে বললেন, "আমার চরিত্র যদি খালি গায়ে থাকার দাবি করে, একজন অভিনেতা হিসেবে আমি তা না করি কীভাবে?" এরপর যোগ করলেন, প্রতিটি অভিনেতার কাজ করার ধরন আলাদা।

বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "সবকিছুরই উত্থান-পতন থাকে। দক্ষিণী সিনেমারও খারাপ সময় ছিল, সেখান থেকে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। বাংলা সিনেমাও ফিরবে, বিশ্বাস রাখুন।"

কথার মাঝেই এলো রাজনীতির প্রসঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর কথা তুলতেই বিজয় হেসে জানতে চাইলেন, "আপনারা তাকে 'দিদি' বলতেন না? এই যে সুন্দর ডাকনাম বা সম্বোধন খুঁজে নেওয়া—বাঙালিরা এটি খুব দারুণ পারে!"

পুরো আলাপচারিতায় তিনি বিনয়ের সাথে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করছিলেন। সে কথা উল্লেখ করতেই মুচকি হেসে বললেন, "এটি পারস্পরিক সম্মানের বিষয়। প্রথমবার কথা হচ্ছে, তাই সম্মান জানানোটা জরুরি, তাই না?"

সাই পল্লবীর আগমন ও শুটিংয়ের ব্যস্ততা : সাত মিনিটের কথোপকথন শেষ। শুটিং ইউনিট থেকে ডাক এলো, আবার ক্যামেরার সামনে ফিরে গেলেন বিজয়।

এরই মধ্যে কখন যে আরেকটি সাদা ইনোভা গাড়ি এসে থামল, তা টেরই পাওয়া যায়নি। গাড়ির দরজা খুলে নামলেন সাই পল্লবী। খয়েরি রঙের স্লিভলেস পোশাক, কোঁকড়ানো চুলে রাতের বাতাস খেলা করছে। মুখে বাড়তি কোনো রূপটান বা আড়ম্বর নেই। ততক্ষণে হাওড়া ব্রিজের দুই পাশে ভিড় জমে গেছে। হঠাৎ ভিড় থেকে একজন চিৎকার করে উঠলেন, "আই লাভ ইউ, পল্লবী!" সাই পল্লবী শুধু মিষ্টি একটি হাসি দিলেন। সেই হাসিতে লজ্জাও ছিল, আবার আন্তরিকতাও ছিল।

শুটিং ইউনিটের এক সদস্য জানালেন, দিনের বেলা খুব একটা পানি পান করেন না এই অভিনেত্রী। তবে প্রতিদিন তার জন্য ২০টি ডাব রাখা হয়।

এরপর শুরু হলো গানের দৃশ্য ধারণ। এ আর রহমানের সুরে গান বাজছে। দৃশ্যটি খুব ছোট—সামনে হাঁটছেন সাই পল্লবী, কয়েক পা পেছনে বিজয় সেতুপতি। মনিটরের সামনে বসে নির্দেশনায় মণি রত্নম। কখনো ক্লোজ শট, কখনো মিড শট, কখনো জিমিজিবে চলমান ক্যামেরা। একই দৃশ্য ধারণ করা হলো ১৫-১৬ বার। প্রতিবার একই হাঁটা, একই অভিব্যক্তি। সিনেমা দেখতে যতটা রোমাঞ্চকর, শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা ততটাই ধৈর্যের।

ভোরের দিকে ব্রিজে পথচারী বাড়ছিল। অনেকেই জানতে চাইছিলেন ছবির নাম, কিন্তু গোপনীয়তার কারণে উত্তর মেলেনি। অনেকে আবার সাই পল্লবীকে চিনতে না পেরে গুগলে ছবি মিলিয়ে নিশ্চিত হচ্ছিলেন।

ক্যামেরার লেন্স বদলানোর ফাঁকে ব্রিজের এক পাশে এসে বসলেন বিজয়। এক ভক্তের সাথে হ্যান্ডশেক করলেন, অন্যজনকে জড়িয়ে ধরলেন। তবে মোবাইল বের হতেই হেসে বারণ করলেন, "সেলফি নয় প্লিজ, আমি মূল লুকে আছি।"

অন্য পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পরিচালক মণি রত্নম। বেগুনি টি-শার্ট ও জিন্স পরা শান্ত এই নির্মাতার কোনো অস্থিরতা নেই। অল্প কথায় নির্দেশ দিচ্ছেন, আর সেটের সবাই জানে পরের মুহূর্তে কী করতে হবে।

স্মৃতি ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা : এই ছবিতে প্রথমবার একসাথে জুটি বাঁধছেন বিজয় সেতুপতি ও সাই পল্লবী। আর সাই পল্লবীকে প্রথমবার পরিচালনা করছেন মণি রত্নম। কলকাতায় টানা ১০ দিন শুটিং চলবে। হাওড়া ব্রিজ ছাড়াও কুমোরটুলি, পার্ক স্ট্রিট, বেলগাছিয়া ও নিউ মার্কেটে দৃশ্য ধারণ করা হবে। এরপর ইউনিট যাবে পুদুচেরিতে। কিছু দৃশ্যে ভার্চুয়াল প্রোডাকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

প্রায় দুই দশক আগে মণি রত্নমের ‘যুবা’ সিনেমার শুটিংও এই হাওড়া ব্রিজে হয়েছিল। এতদিন পর আবার ফেরা। শহর বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু সিনেমার জন্য কলকাতার আকর্ষণ একটুও কমেনি।

ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে গঙ্গার পানিতে এসে পড়ছে। ইউনিট গোছগাছ শুরু করেছে। হাওড়া ব্রিজ আবার ফিরে যাচ্ছে তার চেনা ব্যস্ততায়। বড় পর্দায় হয়তো এই গান মাত্র কয়েক মিনিটের হবে, কিন্তু তার পেছনে লুকিয়ে ছিল একটি দীর্ঘ রাত। আর সেই রাতের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল ঐতিহ্যবাহী হাওড়া ব্রিজ।