উত্তম চরিত্রে দীপঙ্কর দে: এক আজীবন আক্ষেপের ইতিহাস

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
Main News Image

কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবসে স্মৃতির সাগরে ডুব দিলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা দীপঙ্কর দে। পরিচালক তপন সিনহার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এ মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় করার কথা থাকলেও, পরিস্থিতির চাপে সেই চরিত্রে অভিনয় করতে হয় দীপঙ্কর দে-কে। আর এই একটি সিদ্ধান্তই সেই সময়ে তাঁর জীবনে বয়ে এনেছিল প্রচণ্ড মানসিক চাপ, পুরো টলিউড ইন্ডাস্ট্রির ক্ষোভ এবং এক অপূরণীয় আক্ষেপ।

ছবির সেট ও শুটিং নিয়ে জটিলতা : ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ ছবির ডাবলু (বা মূল চরিত্র) ভাবনায় তপন সিনহার প্রথম পছন্দ ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। উত্তম কুমার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থাতেই বেডে শুয়ে ছবির চিত্রনাট্য পড়েন। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফেরার পর উত্তম কুমার শুটিংয়ের দিন কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। ততদিনে সূর্যপুরে একটি আস্ত বাগানের বিশাল সেট তৈরি হয়ে গিয়েছিল। দিন পেছালে বাগানের গাছপালা শুকিয়ে যেত এবং প্রযোজকের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হতো।

বাধ্য হয়ে তপন সিনহা সহকারী নির্দেশককে পাঠিয়ে উত্তম কুমারের থেকে চিত্রনাট্য ফেরত আনিয়ে নেন। ঘটনাটিতে মারাত্মক মর্মাহত হয়েছিলেন মহানায়ক।

দীপঙ্কর দের নির্বাচন ও টালিগঞ্জের রোষ : উত্তম কুমার সরে দাঁড়ানোর পর নতুন মুখের খোঁজ শুরু হয় এবং ডাক পান দীপঙ্কর দে। দীপঙ্কর দে যখন ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “যে চরিত্র উত্তম কুমারের করার কথা ছিল, সেটা কি আমি পারব?” তপন সিনহা তখন এক বাক্যে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, “ও সব তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও।”

কিন্তু রিহার্সাল শেষে শুটিং শুরু হতেই পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নেয়, পরিচালক তপন সিনহার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন উত্তম কুমার (যদিও আইনি লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত উত্তম কুমার হেরে যান)।

ইন্ডাস্ট্রির বিরোধিতা: গোটা টালিগঞ্জ দীপঙ্কর দের বিরুদ্ধে চলে যায়। সবার মনে একটাই প্রশ্ন ছিল— উত্তম কুমারের জায়গায় কেন অন্য কেউ অভিনয় করবে? মনের কথা আড়ালেই রয়ে গেল। দীপঙ্কর দে চেয়েছিলেন উত্তম কুমারকে ফোন করে অনুমতি নিতে এবং তাঁকে বোঝাতে যে তিনি একজন শিল্পী হিসেবেই কাজটা করছেন, মহানায়কের জায়গা কেড়ে নেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু পরিচালক তপন সিনহা তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “তুমি কাউকে ফোন করবে না।”

২৪ জুলাইয়ের সেই রাত: ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই রাতে আসে উত্তম কুমারের প্রয়াণের খবর। ভবানীপুরের ক্ষুব্ধ টালিগঞ্জের তোপের মুখে পড়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও ভবানীপুরে মহানায়কের বাড়িতে ছুটে যান দীপঙ্কর শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

বরফের ওপর শুইয়ে রাখা উত্তম কুমারকে একঝলক দেখে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি তিনি, তখনই চলে আসেন।

উত্তম কুমারের মতো মহান শিল্পীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করতে না পারার যন্ত্রণা আজও তাড়িয়ে বেড়ায় দীপঙ্কর দে-কে।

দীপঙ্কর দের স্বীকারোক্তি: "একবার মনের কথা বলতে না পারার একটা আক্ষেপ আমার আজও রয়ে গিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, উত্তমদার মতো অত বড় শিল্পী ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এ আমার চেয়ে অনেক অনেক ভালো অভিনয় করতেন।"