মাংসের মানচিত্র
প্রেশার কুকার থেকে হিসহিস শব্দে বেরিয়ে আসছে গরম বাষ্প। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম মশলা আর পেঁয়াজের ঝাঁজ মেশানো এক অদ্ভুত সুবাস। পাতে পড়ার আগেই এই ঘ্রাণই ইন্দ্রিয়কে জানিয়ে দেয়—বাড়িতে মাংস রান্নার আয়োজন চলছে।
'মাছে-ভাতে বাঙালি' প্রবাদটি এখন অনেক দেশীয় মাছের মতোই প্রায় বিলুপ্ত। চড়া দামের কারণে চাষের পাঙ্গাশ আর তেলাপিয়ার বাইরে অন্য সব মাছই মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। রোজকার আমিষের চাহিদা পূরণে ভরসা এখন ছিবড়ে স্বাদের ফার্মের মুরগি, ডাল আর পোল্ট্রির ডিম। ছাপোষা জীবনে তাই পাতে গরু বা খাসির মাংস নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ। ঈদুল আজহা—যা আমাদের কাছে কোরবানির ঈদ হিসেবেই পরিচিত—একটি ধর্মীয় উৎসব হলেও একে ঘিরে মূল আনন্দটা যেন মাংস কেন্দ্রিক। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রায় সবার বাড়িতেই এই দিনে কিছুটা মাংস রান্না হয়; তৃপ্তি করে খাওয়া মাংস-ভাতেই পূর্ণতা পায় কোরবানির ঈদের আনন্দ।
চড়া দামের কারণে মধ্যবিত্তের পাত থেকে ক্রমশ বিলীন হতে থাকা গরুর মাংস কিছুটা সহজলভ্য হয়ে ওঠে কোরবানির সময়। যারা পশু কোরবানি করেন, তাদের বাড়িতে টানা কয়েক দিন প্রায় প্রতি বেলাতেই চলে মাংসের ভোজন। আবার কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন ও সমাজের অসচ্ছল মানুষদের মাঝে বিতরণের প্রথা থাকায় যারা বছরের অন্য সময় মাংস কিনে খেতে পারেন না, তারাও এই সময়ে একটু তৃপ্তির স্বাদ পান। প্রথাগত মাংস ভুনা বা আলু দিয়ে ঝোলের মতো আটপৌরে রান্নার পাশাপাশি অনেকেই এখন খোঁজেন মাংসের ভিন্ন স্বাদ। রেজালা, দোপেঁয়াজা কিংবা কোরমার মতো মোগলাই রসনার বাইরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাংস রান্নায় রয়েছে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া। কোথাও হাঁড়িতে জায়গা করে নেয় স্থানীয় কোনো উপাদান, কোথাও আবার স্বাদের চেয়েও প্রাধান্য পায় সংরক্ষণের কৌশল।
লেবু জাতীয় এক ধরণের টক স্বাদের ফলের নাম 'সাতকড়া'। পাওয়া যায় সিলেটের বৃষ্টিস্নাত পাহাড়ি অঞ্চলে। জাফলং ও জৈন্তার টিলায় কিছুটা উৎপাদন হলেও বাকিটা আসে ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে। সিলেট অঞ্চলের মানুষের কাছে মাংস রান্নায় সাতকড়ার উপস্থিতি তাদের নিজস্ব স্বাদের স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক। সাতকড়ার সুবাস সিলেটের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে সুদূর বিলেতেও। ইংল্যান্ডের কারি শিল্প বা ভারতীয় রেস্তোরাঁগুলোর সিংহভাগই সিলেট থেকে যাওয়া প্রবাসীদের মালিকানাধীন। 'দ্য গার্ডিয়ান'-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের ৮ হাজারের বেশি রেস্তোরাঁর মালিকানা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের হাতে। ষাট ও সত্তরের দশকে সিলেট থেকে হাজারে হাজারে তরুণ পাড়ি জমিয়েছিলেন বিলেতে; ওছি (Onion Cutter) আর ডিসি (Dish Cleaner)-এর চাকরি নিয়ে। ইংল্যান্ডে এই 'কারি ইন্ডাস্ট্রি' হয়ে উঠেছিল বিশ্বায়নের প্রতীক। সপ্তাহান্তের সান্ধ্যকালীন পানীয়র আড্ডা শেষে কারি হাউজে গিয়ে টিক্কা মাসালা, মাদ্রাজি কোরমা বা ভিন্দালু খাওয়া হয়ে উঠেছিল নাগরিক সংস্কৃতির অংশ—ঠিক যেমন একটা সময় ঢাকার উঠতি মধ্যবিত্তের চিনা রেস্তোরাঁয় যাওয়ার চল ছিল। ঢাকার চিনা রেস্তোরাঁর খাবার যেমন চীনারা রান্না করত না, তেমনি বিলেতের বেশিরভাগ ভারতীয় কারি রেস্তোরাঁর বাবুর্চিরাও ছিলেন বাংলাদেশি, বিশেষ করে সিলেটের। তাদের রান্না করা সাতকড়া দিয়ে গরুর মাংস কিংবা ভেড়ার মাংস (ল্যাম্ব মিট) রয়েছে অধিকাংশ রেস্তোরাঁর মেন্যু কার্ডে। সাহেব থেকে খাঁটি বঙ্গদেশীয়—সবাই মজেছেন সাতকড়া-মাংসের হালকা তেতো স্বাদের ঝোলে।
সাতকড়া দিয়ে মাংস রান্নাকে তুলনা করা যায় শিল্পের সঙ্গেই। তেল, মশলা আর মাংসের মানের পাশাপাশি সঠিক সাতকড়া বেছে নেওয়াটাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোন সাতকড়াটি তিতকুটে আর কোনটি হালকা অম্লীয় স্বাদ আনবে, তা বোঝার জন্য অভিজ্ঞ রাঁধুনির জহুরি চোখ চাই। অভিজ্ঞদের মতে, টেনিস বলের আকৃতির কিন্তু ওজনে হালকা সাতকড়া কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ। কেনার সময় দেখতে হবে খোসা যেন মসৃণ আর হালকা সবুজ হয়। কেউ কেউ তিতা ভাব কমাতে সাতকড়া কেটে হালকা পুড়িয়ে নেন। মাংসের হাড়ের ঝোল বা 'পাঞ্চা' রান্নাতেও সাতকড়া ব্যবহার হয়। রান্নার ধরনে ভিন্নতা থাকলেও সাতকড়া-মাংসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—একটি লেবুজাতীয় ঘ্রাণ আর সামান্য অম্লীয় তিতকুটে ভাব, যা মাংসের চর্বির চিটচিটে স্বাদকে জিভে লাগতে দেয় না। মজার ব্যাপার হলো, সিলেট থেকে সাতকড়া সুদূর বিলেতে পাড়ি দিলেও দেশের অন্য অঞ্চলে এটি খুলনা-যশোরের 'চুইঝাল' কিংবা চট্টগ্রামের 'মেজবানি'র মতো জনপ্রিয়তা পায়নি।
চুই মূলত একটি ঔষধি লতা বা গুল্ম। দেখতে অনেকটা পান গাছের মতো। এর লতা, কাণ্ড বা শিকড় খুলনা-যশোর অঞ্চলে মাংসের প্রধান অনুষঙ্গ। গোলমরিচ পরিবারের এই সদস্য স্বাদে বেশ ঝাঁঝালো। রান্নায় আদার মতো ঝাঁঝ আর এলাচ-দারুচিনির মতো নিজস্ব ঘ্রাণ যোগ করে এই চুই। খুলনার চুকনগরের 'আব্বাস হোটেলের' চুইঝাল দিয়ে খাসির মাংস একসময় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিল। এই চুইঝালের স্বাদ নিতে গিয়েই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ক্রিকেটার মানজারুল ইসলাম রানা। খুলনার জিরো পয়েন্টের 'কামরুলের হোটেল' কিংবা সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার 'হুজুরের দোকান'—এসব জায়গায় চুইঝাল দিয়ে মাংস খেতে এখনো দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে। এসব হোটেল খুব একটা আধুনিক বা জাঁকজমকপূর্ণ নয়; সাধারণ অ্যালুমিনিয়ামের গামলায় রাখা ঘন কালচে ঝোলের মাংস, সাথে আস্ত রসুন আর এক টুকরো চুইঝাল—এটুকুই ভোজনরসিকদের পরম তৃপ্তি। তবে বর্তমানে ফুড ভ্লগারদের প্রভাবে এসব জায়গার বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেছে, বেড়েছে দাম আর কোথাও কোথাও হারিয়েছে সেই আদি স্বাদ।
পদ্মা সেতুর কল্যাণে দক্ষিণবঙ্গের চুইঝাল এখন রাজধানীতেও দারুণ জনপ্রিয়। চুকনগরের আব্বাস হোটেলের শাখা এখন মিরপুরে, আবার 'সিরাজ চুইগোস্ত'র মতো চেইন রেস্তোরাঁও ছড়িয়ে পড়েছে শহরে। এমনকি এই স্বাদ এখন পৌঁছে গেছে উত্তরবঙ্গের বগুড়াতেও।
কুলখানি, শিন্নি বা জেয়াফত—মৃত ব্যক্তির স্মরণে চট্টগ্রামে যে মেজবানি আয়োজন হয়, তা এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই রান্নার জনপ্রিয়তা এতই বেশি যে, নামী কোম্পানিগুলো এখন 'মেজবানি মাংসের মশলা' নামে আলাদা প্যাকেটজাত মশলা বিক্রি করছে। মেজবানি রান্নার বিশেষত্ব হলো মশলার নিখুঁত অনুপাত আর রান্নার ধরন। একসময় 'চিটাগং রেড ক্যাটেল' বা চাটগাঁইয়া লাল গরুর মাংস দিয়ে বড় তামার পাতিলে লাকড়ির চুলায় এই মাংস রান্না হতো। সরিষার তেল, বাটা মশলা আর বিশেষ এক ধরণের 'রাঁধুনি' (মশলা) ও হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচের ব্যবহার একে দেয় অনন্য স্বাদ ও টকটকে লাল রঙ—যা ঝাল না বাড়িয়েও চোখের আরাম দেয়।
মাংসের এই বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে পুরো দেশে। রাজশাহী অঞ্চলের গরুর হাটে পাওয়া যায় কড়াইয়ে ভাজা এক ধরণের 'কালাভুনা'। বগুড়ায় আলু সেদ্ধ করে চটকে রান্না হয় ঐতিহ্যবাহী 'আলুঘাঁটি'। রংপুর অঞ্চলে আছে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য 'মাংসের আচার'। ঢাকায় এখন খলিলের বিফ হোটেল কিংবা আবেশ হোটেলের হান্ডি মাংস আর পেশোয়ারি বিফ খেতে রীতিমতো দীর্ঘ লাইন পড়ে।
মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি গরুর মাংস খাওয়া হয় আর্জেন্টিনাতে, বছরে প্রায় ৪৮ কেজি। এরপর আছে ব্রাজিল, প্রায় ৪০ কেজি। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ-এর ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন মানুষ বছরে গড়ে মাত্র ১.২২ কেজি গরুর মাংস খায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাবারের পাতে মাংসের পরিমাণটাই থাকে বেশি। একটা বিফ স্টেকে একেকজন প্রায় ৬০০ গ্রাম মাংস খেয়ে থাকেন। সেখানে বাংলাদেশে ৪ জনের একটি পরিবারে ১ কেজি গরুর মাংস কিনলে তা অন্তত দুই বেলা খাওয়ার চেষ্টা করা হয়। তাতে প্রতি বেলায় জনপ্রতি মাংস জোটে ১৫০ গ্রামেরও কম। কোরবানির ঈদের সময় হয়তো পরিমাণটা একটু বাড়ে, তবে চড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষ উৎসব ছাড়া এখন আর গরুর মাংস খুব একটা কিনে খেতে পারে না। একথালা ভাতে দুই টুকরো মাংস আর খানিকটা ঝোল—ঈদের কল্যাণে অনেকের পাতে এইটুকু জুটলেই তারা খুশি। সেই ঝোলে কোথাও মিশবে সাতকড়ার ঘ্রাণ, কোথাও চুইয়ের ঝাঁঝ। যে নামেই ডাকুন না কেন,রোজকারের ডাল-ভাতের বদলে একবেলা তৃপ্তির মাংস-ভাত মানেই তো উৎসব!
(লেখক পরিচিতি-সামীউর রহমান সিনিয়র রিপোর্টার, আগামীর সময় পেশায় ক্রীড়া সাংবাদিক, তবে দেহে মনে প্রাণে খাদ্যরসিক। ক্যানভাস ম্যাগাজিন সহ বিভিন্ন প্রকাশনায় খাবার নিয়েও লেখালেখি করেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত 'দুই বাংলার চায়ের ঠেক' ও 'দুই বাংলার বেকারিনামা' বইতে লেখকের দুটো রচনা স্থান পেয়েছে।)