আলখেল্লায় ঢাকা আলি খামেনির ডান হাতের রহস্য
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে গত সাড়ে চার দশক ধরে যখনই প্রকাশ্যে দেখা গেছে, তিনি সবসময় অনুগামীদের উদ্দেশে তার বাঁ হাত নাড়িয়েই অভিবাদন জানিয়েছেন। পবিত্র কোরানে হাত রেখে শপথ নেওয়া থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নথিতে স্বাক্ষর—সব কাজই তিনি করতেন বাঁ হাতে। তার ডান হাতটি সবসময় ঢাকা থাকত কালো বা বাদামি রঙের আলখেল্লায়। জনসমক্ষে কখনো তার ডান হাত সক্রিয় অবস্থায় দেখা যায়নি।
এই রহস্যের সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৮১ সালের ২৭ জুন, যা খামেনির জীবনে এক অভিশপ্ত দিন হিসেবে চিহ্নিত। ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালীন তেহরানের আবুজার মসজিদে এক সমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন তিনি। এ সময় মঞ্চে থাকা একটি টেপ রেকর্ডারে আচমকাই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এটি ছিল খামেনির ধর্মীয় শাসনের বিরোধী 'ফোরকান গ্রুপ'-এর একটি পরিকল্পিত বোমা হামলা। এই বিস্ফোরণে খামেনির ডান হাতটি গুরুতর জখম হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও চিকিৎসকরা তার হাতের স্নায়ু সচল করতে পারেননি, ফলে ডান হাতটি চিরতরে পক্ষাঘাতে অকেজো হয়ে যায়।
তবে এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা খামেনিকে থামাতে পারেনি। তিনি নিজেই বলতেন, যতক্ষণ আমার মস্তিষ্ক সচল থাকবে এবং আমি কথা বলতে পারব, ততক্ষণ আমার ডান হাতের প্রয়োজন নেই।
এরপর তিনি ধীরে ধীরে বাঁ হাতে লেখার ও সমস্ত দৈনন্দিন কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলেন। পক্ষাঘাতগ্রস্ত ডান হাতটি জনসমক্ষে না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি, যা আজীবন তার পোশাকের আড়ালেই ঢাকা থাকত।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের এই দীর্ঘকালীন প্রবাদপ্রতিম সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নেতা নিহত হন। তার মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ও ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে ইরানে ৬ দিনের কর্মসূচির মাধ্যমে দাফন কার্য সম্পন্ন হয়। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ইরানের ইতিহাসের এক দীর্ঘ বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান ঘটল, যেখানে তার অকেজো ডান হাতটি হয়ে রইল তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের এক নীরব প্রতীক।