আল্লারদর্গা বাজারের মরণফাঁদ সংস্কারে ৩২ কোটি টাকার প্রকল্প: দৌলতপুরবাসী স্বস্তিতে
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার শিল্পনগরী খ্যাত আল্লারদর্গা বাজারের চরম জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ১.৫০ কিলোমিটার সড়কটির সংস্কারকাজ অবশেষে শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা আনুষ্ঠানিকভাবে এ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। দীর্ঘদিন পর বহুল কাঙ্ক্ষিত এ সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় দুর্গত অবস্থার অবসান ও স্বস্তির আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অধিবাসী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা।
কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া এই প্রকল্পে রড ও সিমেন্টের কংক্রিট (আরসিসি) দিয়ে সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের জন্য দুই পাশে আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হবে।
ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা ও সড়কের ওপর বৃষ্টির পানি জমে হাঁটু পানির সৃষ্টি হওয়ায় আল্লারদর্গা নাসিরনগর থেকে আল্লারদর্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার সড়কটি কার্যত ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছিল। ৪৬১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ও প্রায় ৫ লাখ মানুষের বসবাসের এই উপজেলায় জেলা ও দেশের অন্যান্য প্রান্তের সাথে সংযোগকারী প্রধান পথ এটি। কুষ্টিয়া-প্রাগপুর রুটের অন্যতম এই ব্যস্ত সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১ থেকে ২ হাজার যানবাহন এবং প্রায় ৫০ হাজার মানুষ যাতায়াত করেন।
সড়কটির খানাখন্দ ও বিশাল আকারের গর্তের কারণে মাত্র ১০ মিনিটের পথ পার হতে যানবাহনগুলোর ৪০ থেকে ৫০ মিনিট, এমনকি কোনো কোনো সময় এক ঘণ্টাও লেগে যেত। এতে প্রতিদিন শত শত কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সিএনজি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেলসহ ছোট পরিবহনগুলো প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় পতিত হতো। ড্রেনের পানি জমে থাকায় গর্তের অবস্থান বুঝতে না পেরে উল্টে যেত পণ্যবোঝাই ট্রাক ও পিকআপ।
সড়কের এ বেহাল অবস্থার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছিল এলাকার কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। একই সাথে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেফারকৃত মুমূর্ষু রোগীদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স যানজটে আটকে পড়ায় এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে পোহাতে হতো চরম ভোগান্তি। রাস্তার দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা ও জলাবদ্ধতা এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছিল। পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকা এবং ফুটপাত দখল করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণেই সড়কটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
অবশেষে ৩২ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পদক্ষেপে বাজার এলাকার দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অবসানের পথ সুগম হলো। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা কাজের মান বজায় রেখে দ্রুততম সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করার নির্দেশ দেন, যাতে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনজীবন দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।
গুণগত মান বজায় রেখে দ্রুত কাজ শেষ করা হলে শিল্পনগরী খ্যাত আল্লারদর্গা বাজারের স্থবির হয়ে পড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জনজীবন পুনরায় গতিশীল হবে বলেই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
কুষ্টিয়া-প্রাগপুর রুটের বাসচালক রাতুল ইসলাম বলেন, ভাঙা রাস্তা আর তীব্র যানজটের কারণে এইটুকু বাজার পার হতেই অনেক সময় এক ঘণ্টার ওপর লেগে যায়। খানাখন্দের ঝাঁকুনিতে প্রতিদিন গাড়ির পার্টস নষ্ট হয়ে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এখন আরসিসি রাস্তা হলে আমরা সময়মতো নিরাপদে গাড়ি চালাতে পারব।
স্থানীয় বাসিন্দা সাংবাদিক জালাল উদ্দীন জানান, বছরের পর বছর ধরে এই বাজারে পারাপার হতে গিয়ে আমরা নরকযন্ত্রণা ভোগ করছি। আমরা চাই রাস্তার দুই ধারে অবৈধ দখলমুক্ত করে আর টেকসই ড্রেন ও রাস্তা বানিয়ে দ্রুত এ দুর্ভোগ থেকে আমাদের স্থায়ী মুক্তি দেওয়া হোক।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ মনজুরুল করিম জানান, পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে সড়কটি বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। সাময়িকভাবে ইট ফেলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হলেও তা স্থায়ী সমাধান ছিল না। এবার সড়কটির দুই পাশে সুপরিকল্পিত ড্রেনেজ নির্মাণ এবং রড-সিমেন্টের কংক্রিট দিয়ে মজবুত সড়ক তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আগামী বহু বছর আল্লারদর্গা বাজারে আর জলাবদ্ধতা বা সড়ক ভাঙনের সমস্যা থাকবে না।
প্রকল্পের উদ্বোধনকালে সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, আল্লারদর্গা বাজারের এই সড়কটি দৌলতপুরবাসীর জন্য দীর্ঘদিনের এক বড় যন্ত্রণার কারণ ছিল। অবহেলা ও জলাবদ্ধতার কারণে সড়কটি চলাচলের একেবারেই অযোগ্য হয়ে পড়ে। জনগণকে এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছি। ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে মানসম্মত আরসিসি ঢালাই রাস্তা ও টেকসই ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আর পানি জমে রাস্তা নষ্ট না হয়। কাজের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।