সেই দেশ, এই দেশ (৬ষ্ঠ পর্ব)
ছবি: শরীফুল আলম
সেবার ছিল "বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স"-এর ঢাকা-নিউইয়র্ক এবং নিউইয়র্ক-ঢাকার সম্ভবত শেষ ফ্লাইট। তারপর নানা ধরনের সিভিল এভিয়েশন-সংক্রান্ত জটিলতা, গ্রাউন্ড ভায়োলেশন, বিমানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন ত্রুটি, সেফটি ভায়োলেশন ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশ বিমানকে আর নিউইয়র্কের আকাশে দেখা যায়নি। বিমানের জন্য নির্ধারিত যে স্লটটি ছিল, সেটিও হারিয়ে যায়।
সেবার ঢাকা-নিউইয়র্ক যাত্রায় আমার রুট ছিল বেলজিয়ামের ব্রাসেলস হয়ে জে.এফ.কে. (নিউইয়র্ক)। সেটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম ইউরোপ সফর। টাইম জোনে এগিয়ে থাকার কারণে একই দিনে আমেরিকায় পৌঁছানো যায়, সেটিও তখন প্রথম জানলাম।
আমি যতবার দেশে কিংবা বিদেশে গিয়েছি, ততবারই মনে হয়েছে এই বুঝি আমার পাসপোর্ট বা বোর্ডিং পাস হারিয়ে ফেললাম। আবার মনে হয়েছে, ভুল করে বুঝি ভুল গেটে এসে ভুল ফ্লাইট ধরতে যাচ্ছি। এখানে বলে রাখা ভালো, বিশেষ করে ইউরোপের বড় বিমানবন্দরগুলোতে এক গেট থেকে অন্য গেটের দূরত্ব অনেক বেশি হয় এবং বেশ খানিকটা পথ হেঁটে যেতে হয়। একবার ভুল করে গেট মিস করলে দৌড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত বিমান আর ধরা সম্ভব নয়। সাধারণত এমন ভুল যাত্রীদের খুব কমই হয়। তারপরও হঠাৎ দু-একজনের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে। তাই সবাই নিজ নিজ ডিপারচার গেট স্ক্রিনে দেখে নিশ্চিত হয়ে নেয়।
যা বলছিলাম, বিমান-বেলজিয়াম-ব্রাসেলস-নিউইয়র্ক যাত্রার কথা। দীর্ঘ পথযাত্রায় জ্বালানি সংগ্রহের জন্য তখন ব্রাসেলসে যাত্রাবিরতি করতে হতো। বিমান যখন ব্রাসেলসের রানওয়ে স্পর্শ করবে করবে ভাব, তখনও আকাশে গরুর পালের মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল।
ভাগ্যিস আকাশপথেই আমি আমার পছন্দের ঐতিহ্যবাহী খাবার চেয়ে নিয়েছিলাম। নইলে এক ইউরো দিয়ে সেখানে কিছুই পাওয়া যেত না। এখানে বলে রাখা ভালো, কোনো সামাজিক আচার-আচরণ, স্টাইল, শিল্প-সাহিত্য কিংবা সামাজিক মর্যাদা বিদেশে গিয়ে আমি কখনো খুঁজিনি। আমি বিশ্বাস করি, কাঁটা-চামচ দিয়ে পাকা কলা খাওয়ার কোনো অর্থ হয় না।
আমাদের সময় আমাদের দেশটা অনেক মহান ছিল। সেখানে সম্মান ছিল, গৌরব ছিল। এখন সেই সমাজটা কেমন যেন নষ্ট হয়ে গেছে; পুরোনো মূল্যবোধ ভেঙে পড়েছে। রাস্তায় বেরুলে মনে হয়, প্রাপ্য মর্যাদাটুকু এই বুঝি কেউ একজন কেড়ে নেবে। "আমরা" এবং "ওরা"র বিভাজনে দেশটা যেন ক্রমশ ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
মানুষের ভয়, রাগ এবং হতাশা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। বুদ্ধিজীবীরা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। কেউ নিজেকে কম দেশপ্রেমিক মনে করছেন, আবার কেউ বেশি দেশপ্রেমিক হওয়ার দাবি করছেন। সমাজ ধীরে ধীরে তার নৈতিকতা হারাচ্ছে। আমাদের সংস্কৃতিও তার নিজস্ব চরিত্র হারাতে বসেছে। পরিবারগুলো কেমন যেন ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। শৃঙ্খলা, আনুগত্য, সম্মান ও ভদ্রতার এখন আর তেমন কোনো কদর নেই।
দিনে দিনে আমরা সব হারাচ্ছি। নাগরিক সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা হারাচ্ছে। একটু আগেও যে দেহে প্রাণ ছিল, এখন সেখানে প্রাণ নেই। চারদিকে যেন এক ধরনের অসহিষ্ণুতা।
দখলবাজেরা নদী-নালা গ্রাস করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে মাটিতে কেঁচোর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর ফলে একদিকে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এখন বাড়ির আঙিনায় ব্যক্তিগত ফুলের বাগান খুব একটা দেখা যায় না। ফলে পরাগবাহী মৌমাছির সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। ব্যাঙ, ঘাসফড়িং, জোনাকি পোকার মতো প্রাণী এবং কৃষিবান্ধব পাখির সংখ্যাও কমে চলেছে। এসব পরিবর্তনে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার একটি স্পষ্ট সংকেত আমি দেখতে পাচ্ছি।
মাটি ধীরে ধীরে তার প্রাণশক্তি হারাচ্ছে, আর এর ফলে খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ছে। যেভাবে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে, তাতে অচিরেই বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও খাদ্য-অস্তিত্বের প্রশ্ন সামনে চলে আসতে পারে। খাদ্য উৎপাদনে যদি সঠিক প্রোটোকল অনুসরণ না করা হয়, তবে উৎপাদিত খাদ্য কখনোই সম্পূর্ণ নিরাপদ হবে না।
এখন এই পরিণত বয়সে এসে ভাবি, যদি দেশে থাকতাম, তাহলে হয়তো বহু আগেই ছিটকে পড়তাম। আমি যে আদর্শ লালন করি, সেই আদর্শে এতদিন অবিচল থাকতে পারতাম কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
একজনের বিশ্বাস অন্যজনের বিশ্বাস থেকে আলাদা হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে কি তার জন্য নিশ্চিত মৃত্যু? ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন আমি ভদ্রতা জানি, কিন্তু উদারতার সঙ্গে তোমাকে ভুল করার সুযোগও দিচ্ছি। কাউকে ভুল মনে করে তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কি সত্যিই কারও আছে?
অথচ আজকাল যা দেখা যাচ্ছে, ভিন্নমতের মানুষকে ভুল মানুষ মনে করে শত্রু বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ভলতেয়ারের একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে যায়:
"তোমার কথার সঙ্গে আমি একমত নই, কিন্তু তোমার সেই কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি শেষ পর্যন্ত লড়ব।”