সেই দেশ, এই দেশ (৭ম পর্ব)
বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসে মানুষ মূলত তার প্রিয় শব্দগুলোকেই সবার আগে হারায়, আর সেগুলোকেই সবচেয়ে বেশি মিস করে। প্রিয় মানুষের ডাক, শব্দ, কথার স্বাদ, কোলাহল-হৈহুল্লোড়, চেনা মুখ, চেনা মানুষ, চেনা ভাষা; এসবই সে মিস করে। অথচ এগুলোই আমাদের বেঁচে থাকার আসল প্রাণ।
এই দেশে এসে আমি বুঝতে পেরেছি, প্রতিভার সঙ্গে অধ্যবসায়, সুযোগ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ নিরাপত্তা ভালোবাসে, নিয়মিত রোজগার ভালোবাসে, সঞ্চয় ভালোবাসে। কিন্তু এই দেশের একটি বিশেষ বাস্তবতা হলো, সঞ্চয় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে থাকে। ফলে চাইলেই যে কেউ অন্য দেশে টাকা পাচার করার সুযোগ পায় না।
এই দেশে টাকার কোনো অভাব নেই, কিন্তু সময়ের অনেক অভাব। বাস্তব প্রয়োজনেও এখানে সময় পাওয়া কঠিন। অসুস্থ হলে বড়জোর কেউ বিকল্প ব্যবস্থায় আপনার খোঁজখবর নেবে, দেখাশোনা করবে, তাও অল্প সময়ের জন্য।
আমাদের দেশে সময়মতো বিয়ে না করলে বিপদ, আবার বিয়ে করে সন্তান না হলেও বিপদ; যা এখানে নেই। এখানে নিজের মতো বাঁচা যায়, কিন্তু দেশে নিজের মতো বাঁচা সব সময় সম্ভব হয় না। এখানে কেউ নির্জনতায় আনন্দ খুঁজে পায়, আবার কেউ মানুষের ভিড়ে আনন্দ পায়।
দেশে আমরা মানুষের প্রতিক্রিয়াকে খুব বড় করে দেখি। ফলে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আবার এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করা যায় না। আমরা সব কিছুর হিসাব রাখি; ব্যাংকে কত টাকা আছে, আজ কী কী করতে হবে, বাজার থেকে কী কী কিনতে হবে, কোন মেহমান আসবে, আমি কার মেহমান হব। কিন্তু নিজের হিসাব আমরা কেউ রাখি না। অথচ কোনটি প্রয়োজন আর কোনটি বাদ দেওয়া উচিত, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার একান্তই আপনার।
এই আমেরিকায় এসে শুরুতেই আমি এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি হয়েছিলাম। এখানে কী নেই? প্রাচুর্য আছে, বাক্স্বাধীনতা আছে, প্রশস্ত রাস্তা আছে, মানুষের নিরন্তর কোলাহল আছে। কিন্তু যা নেই, তা হলো মানুষে মানুষে সেই উষ্ণতা।
এই পড়ন্ত বেলায় বুকের গভীরে হঠাৎ জেগে ওঠে হারিয়ে যাওয়া বিষণ্ন, স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা। মানুষের একান্ত বেদনারও একটি নিজস্ব মর্যাদা আছে। শরীরের ক্ষয়ের কথা আমরা এখানে কেউ ভাবি না। তবে আপনজনের অনুপস্থিতি খুব মনে পড়ে, বারবার কড়া নাড়ে। এখানে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না, “খেয়েছ?”, “শরীরটা এখন কেমন?”, “ওষুধ নিয়েছ তো?”
আমেরিকায় ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্য অনেক। সন্তান বড় হয়ে নিজের পৃথিবী নিজেই গড়ে নেয়। স্বাধীনতার এই বিপুল আকাশের নিচে নিঃসঙ্গতার এক নীরব মরুভূমি যেন সবার মাঝেই বিস্তৃত। এখানে বৃদ্ধ মানুষের জন্য নানা ব্যবস্থা আছে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের শূন্যতা পূরণের কোনো প্রযুক্তি নেই।
বাংলাদেশে অভাব আছে, অনিশ্চয়তা আছে, সম্পর্কের টানাপোড়েন আছে। ভালোবাসাও আছে, যদিও অধিকাংশ ভালোবাসার কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। তারপরও সম্পর্কের শিকড় চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে।
লাখো মানুষ শত কষ্ট সহ্য করে, অবর্ণনীয় ক্লান্তি পেরিয়ে ঈদে বাড়ি যায়। অনেকের হয়তো সামান্য আয়োজন, তারপরও প্রাণখোলা গল্প, হাসি, খুনসুটি; এসবের যেন কোনো কমতি নেই।
এখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষ ছুটছে তো ছুটছেই। কেউ বাড়ি ভাড়া দেবে বলে, কেউ মর্টগেজের কিস্তি মেটাবে বলে, কেউ বীমার প্রিমিয়াম দেবে বলে, কেউ করের টাকা জোগাড় করবে বলে, আবার কেউ বিদ্যুৎ-পানির বিল পরিশোধ করবে বলে। অন্তহীন হিসাব মেলাতে সবাই ব্যস্ত।
মানুষ এখানে অনেক কষ্টে অর্থ উপার্জন করে, কিন্তু জীবনের সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদ, অর্থাৎ সময়, হারিয়ে ফেলে। বুকের পাঁজর খুলে যখন চিকিৎসকেরা তাকে বাঁচিয়ে রাখার নতুন পথ তৈরিতে ব্যস্ত, তখনও হয়তো তার মাথায় ঘুরপাক খায়, “অমুক বিলটা দেওয়া হয়েছে তো?”
মানুষের সান্নিধ্যের চেয়ে ডলারটাই যেন তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বেশি অপরিহার্য। অথচ একবারের জন্যও সে ভাবে না, জীবনের ওপর আমাদের অধিকার আসলে কত সামান্য।