সেই দেশ, এই দেশ (পর্ব - ৫)

শরীফুল আলম, নিউইয়র্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম
Main News Image

দেশে থাকাকালীন এক সময় প্রচুর সাইকেল চালাতাম, ঘুড়ি উড়াতাম, বিলে নৌকা চালাতাম। জঙ্গলের কোথায় শিয়ালের গর্ত আছে, খুঁজে খুঁজে বের করতাম। শালিক কোন গাছের গর্তে বাচ্চা ফুটিয়েছে, তার সন্ধান করতাম। উঁচু গাছে চালাক বকের কত বাসা ভেঙেছি, যদি কিছু ডিম পাওয়া যায় সেই আশায়। সন্ধ্যা হলে প্রায়ই নানী বা দাদীর কাছে গল্প শুনতাম।

এখন বুঝতে পারছি, বয়স হলে মানুষ স্মৃতিচারণ করতেই বেশি পছন্দ করে। স্মৃতিচারণ করতে তখন সুখও মেলে, আরামও লাগে। তবে তখনকার তাঁদের গল্পে কোনো মনগড়া কথা ছিল না। তখন অবশ্য আজকের মতো এতটা অস্থিরতা বা অশান্তিও ছিল না। আজকালকার এসব দেখে মনে দুঃখ বাড়ে, একধরনের হতাশাও জন্ম নেয়। অজান্তেই মনে একটা তুলনা চলে আসে। সেই সময়কার দু-চারটি উদাহরণ যে আমার স্মৃতিতে নেই, তা নয়। তারপরও ঠিক বুক ফুলিয়ে সামনে এসে কেউ দাঁড়ায়নি।

ছোটবেলা থেকেই আমি অনেক উচ্চাশা পোষণ করতাম। ফলে প্রত্যাশাও আমার অনেক ছিল। আমার জীবনে যা কিছু পেয়েছি, সবই অনেকটা অপ্রত্যাশিত। তবে ভাগ্য কিছুটা সহায় ছিল, এটা ঠিক। এত কিছু আমার জীবনে ঘটার কথা ছিল না, তবু ঘটেছে। এত বিস্তৃত পরিসর আমার জীবনে হওয়ার কথা ছিল না, তবুও হয়েছে।

আমি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী মানুষ। আবার যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন না, তাঁদের প্রতিও আমার কোনো অসম্মান কিংবা দ্বিধা নেই। আমার যেমন অনুশোচনা আছে, কৃতজ্ঞতাও তেমনি আছে। জীবনে আমি অনেক ভুল জেনেশুনেই করেছি। সেগুলোর জন্য এখন আমার যন্ত্রণা হয়। পৃথিবীর অনেক মোহ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। তবে আমি কবে দেশে ফিরে যাব, মা-বাবার কবরের পাশে গিয়ে বসব, সেই স্বপ্ন এখনও দেখি।

দেশে গেলে রাস্তার দু'ধারে নির্বিকারভাবে মানুষের মল-মূত্র ত্যাগ করার দৃশ্য আমাকে আহত করে। আসলে এই কাজটি যারা করে, তারা নিরুপায় হয়েই করে। যদি পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট থাকত, যদি সহজে সেখানে যাওয়া যেত, তবে আমি নিশ্চিত, কেউ রাস্তায় দাঁড়িয়ে এমন অসভ্য কাজ করত না।

এই দেশে স্বাধীনতা মানে বিশ্বাস, রুচি ও সংস্কৃতির স্বাধীনতা। তবে স্বাধীনতা মানে সীমাহীন অধিকার নয়। এখানে জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দায় সবার। এখানে সবাই সমান মর্যাদায় সহাবস্থান করে। আমরা বৈষম্যহীনতার কথা বলি, অথচ আমরা নিজেরাই নিজেদের বিশ্বাসের বাইরে অন্যের অধিকারকে স্বীকার করি না। পুরোনো অসহিষ্ণুতা এখন নতুন অসহিষ্ণুতার জন্ম দিচ্ছে, ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন আধিপত্যবাদ।

এখানে এসে নিজের না-জানার পরিধিটা বুঝতে পেরেছি। তা সংশোধনের চেষ্টা করতে গিয়েও শুরুতে ইংরেজি বলতে গিয়ে ক্রিয়ার কালে প্রচুর ভুল হতো। যাই হোক, এখন আমার বয়স ৬৪। ৬৪ কোনো যাদুকরী সংখ্যা নয়। ১০০ বছর বয়সেও মানুষের ভুল হতে পারে। তা ছাড়া নিজের কাঁচা চেহারাটাও আর নেই। তারপরও এই বয়সে এসে ভাবি, কোথায় উন্নতি হলো, কোথায় আটকে গেলাম, কতটা অন্যের সাহায্যে নিজেকে নিবেদন করতে পারলাম। সেই হিসাব-নিকাশের মধ্যেই এখন আছি।

এখানে এসে একটি বিষয় আমি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছি। অর্থনৈতিক অস্বস্তি থাকলে স্বাস্থ্য ও ঘুম বিসর্জন হবেই, আর তার পরিণতি হতে পারে অপমৃত্যু।