লেয়ার্স অফ লাইফ : মাতৃত্বের নতুন বন্দনা
ফ্যাশন যখন কেবল চকচকে জরি, শিফন কিংবা সিল্কের সীমারেখা ছাড়িয়ে এক গভীর ভাবনার রূপ নেয়, তখন ক্যাটওয়াক হয়ে ওঠে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মঞ্চ। ঠিক এমনই এক নজির সৃষ্টি হলো মিস ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক র্যাম্পে। বিশ্বমঞ্চে হাজার হাজার ঝলমলে গাউনের ভিড়ে উগান্ডার প্রতিযোগী যখন হেঁটে এলেন, প্রেক্ষাগৃহে তখন নেমে এলো এক মুহূর্তের বিস্ময় ও নিস্তব্ধতা। কোনও কাল্পনিক রূপকথা নয়, তাঁর পরনে স্পন্দিত হচ্ছিল এক মায়ের শরীরে নতুন প্রাণ সঞ্চারের রক্তমাংসের গল্প। অনন্য এই গাউনটির নাম—‘লেয়ার্স অফ লাইফ’ (Layers of Life)। সি-সেকশন বা সিজারিয়ান ডেলিভারির জটিল চিকিৎসা বিজ্ঞান ও নতুন প্রাণ সৃষ্টির অলৌকিক কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক সফরকে পোশাক শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন উগান্ডার প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার কীশা আবদুল্লাহ।
সমাজ বা সাধারণ মানুষের চোখে সি-সেকশনের পর প্রসূতি মায়ের পেটের ওপরের সামান্য একটি কাটা দাগই কেবল দৃশ্যমান হয়। কিন্তু সেই চামড়ার গভীরে লুকিয়ে থাকে আত্মত্যাগ, যন্ত্রণা এবং বেঁচে থাকার দীর্ঘ ইতিহাস। ডিজাইনার কীশা আবদুল্লাহ নিজেও একজন নতুন মা। নিজের মাতৃত্বের রূপান্তর এবং সি-সেকশনের তীব্র দৈহিক অভিঘাত থেকেই এই বৈপ্লবিক পোশাকের জন্ম। সন্তান জন্মের সময় অস্ত্রোপচার কক্ষে প্রসূতি মায়ের গর্ভাশয়ের যে সাতটি স্তরের মধ্য দিয়ে নতুন প্রাণের আগমন ঘটে, সেই জটিল শারীরবৃত্তীয় সফরকেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ক্যুত্যুর গাউনে রূপ দিয়েছেন তিনি।
‘লেয়ার্স অফ লাইফ’ গাউনটির পরতে পরতে টেক্সটাইল আর্টের মাধ্যমে সি-সেকশনের শল্যচিকিৎসার সেই মানচিত্র চিত্রায়িত করা হয়েছে। প্রথম স্তরে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে 'ত্বক'—যা শরীরের বাইরের শক্ত সুরক্ষাবর্ম হিসেবে স্ক্যালপেলের ছোঁয়ায় প্রথম দ্বিধাবিভক্ত হয়। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে ত্বকের ঠিক নীচেই থাকা নরম, চর্বিযুক্ত সুরক্ষাবলয় 'সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট'। তৃতীয় স্তর 'ফ্যাশিয়া' বা মাংসপেশিকে আগলে রাখা শক্ত কানেক্টিভ টিস্যুর জাল এবং চতুর্থ স্তরে পেটের প্রাচীর গঠনকারী 'পেটের মাংসপেশি'। পঞ্চম স্তর 'পেরিটোনিয়াম'—যা উদর গহ্বরের অঙ্গগুলোকে ঢেকে রাখে। ষষ্ঠ স্তরে রয়েছে ভ্রূণ বেড়ে ওঠার মূল আধার 'জরায়ু' এবং সপ্তম স্তরে 'অ্যামনিওটিক থলি'—যা শিশুকে তরলে ভাসিয়ে রেখে সুরক্ষিত রাখে। লাল, গোলাপি, ক্রিম এবং স্কিন শেডের সমন্বয়ে কাস্টম-ডাইড সুতো ও বিশেষ লেয়ারিং টেকনিকে মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসংস্থানকে শিল্পে রূপ দেওয়া হয়েছে।
সাধারণত প্রসূতিবিদ্যার বইয়ের পাতায় আটকে থাকা এই জটিল অ্যানাটমিকে ফ্যাশনের নন্দনতত্ত্বে রূপান্তর দেখে মুগ্ধ হয়েছেন চিকিৎসকমহলও। গাইনোকোলজিস্টদের মতে, এটি সাধারণ সাজপোশাকের গণ্ডি পেরিয়ে সি-সেকশন নিয়ে সমাজে চলে আসা নানাবিধ ট্যাবু ও ভুল ধারণা ভাঙার একটি মাস্টারপিস। সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে সি-সেকশন কোনো সহজ পথ বা বিকল্প নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বড় অস্ত্রোপচার। মা হওয়ার জন্য একজন নারীকে কতটা শারীরিক ঝড়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা এই গাউনের নকশা জনসমক্ষে স্পষ্ট করে তুলেছে।
যেখানে সমাজ অস্ত্রোপচারের দাগ কিংবা ক্ষতকে ঢেকে রাখার প্রবণতা দেখায়, সেখানে মিস উগান্ডা সেই কাটা দাগ ও রক্তমাংসের বাস্তবতাকে চরম গর্বের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছেন। ফ্যাশন সমালোচকদের মতে, ‘লেয়ার্স অফ লাইফ’ কেবল সুন্দর একটি প্রতিযোগিতার গাউন নয়, এটি কোটি কোটি মায়ের শারীরিক সংগ্রাম, নিঃশব্দ যন্ত্রণা ও বিজয়ের এক রূপক প্রতীক। ক্যাটওয়াকের গ্ল্যামার ছাড়িয়ে পোশাকটি আজ মানবদেহের অসীম ক্ষমতা এবং মাতৃত্বের প্রতি বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধাকে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে।