নীরব ঘাতক অস্টিওপোরোসিস: হাড়ের ক্ষয় রোধে সচেতন হোন

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৬ এএম
আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০৩ এএম
Main News Image

ঢাকা, ২৯ অক্টোবর — হাড়ের ক্ষয় ধীরে ধীরে বাড়লেও প্রথম দিকে অনেক সময় এর কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না। বাইরে থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হলেও ভেতরে ভেতরে হাড়ের ঘনত্ব কমতে পারে এবং বাড়তে পারে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগকে ‘নীরব’ অসুখ বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, হাড় ভেঙে যাওয়ার পরই এই সমস্যার কথা ধরা পড়ে।

বয়স বাড়লে এই রোগের ঝুঁকি যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনই হাড়ের স্বাস্থ্য নির্ভর করে দীর্ঘদিনের জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের ওপরও। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান এবং অতিরিক্ত মদ্যপান হাড়কে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। ভারতের ডোম্বিভলির এইমস হাসপাতালের অর্থোপেডিক ও জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জন ডা. বিশাল লাপশিয়া দৈনন্দিন জীবনের কিছু ক্ষতিকর অভ্যাস এবং আগেভাগে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।

১. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি
হাড় মজবুত রাখতে ক্যালসিয়াম অত্যন্ত জরুরি এবং শরীরে এই ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে ভিটামিন ডি। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে হাড়ের স্বাস্থ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার রাখা এবং পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পাওয়ার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। তবে ঘাটতির আশঙ্কা থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে কোনো সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়।

২. দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা
দিনের বেশির ভাগ সময় একভাবে বসে কাটালে শরীরের পাশাপাশি হাড় ও পেশির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নিয়মিত হাঁটাচলা এবং শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হালকা ভার বহন করতে হয়—এমন ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে দারুণ সাহায্য করে। তাই একটানা দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে একটু হাঁটাচলার অভ্যাস করা উচিত।

৩. শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম এড়িয়ে চলা
হাড় ও পেশি একসঙ্গে মিলে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং চলাফেরায় সাহায্য করে। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির শক্তি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উপযুক্ত রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং বা শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম পেশির সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। তবে নতুন করে কোনো ব্যায়াম শুরু করলে নিজের শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মানানসই পদ্ধতি বেছে নেওয়া জরুরি।

৪. ধূমপান
ধূমপানের সঙ্গে হাড়ের দুর্বলতা এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি বৃদ্ধির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব হয়তো সব সময় সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না, কিন্তু দীর্ঘদিন ধূমপান করলে হাড়ের স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করা জরুরি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের বা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

৫. অতিরিক্ত মদ্যপান
নিয়মিত অতিরিক্ত মদ্যপান হাড়ের স্বাস্থ্যে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি অতিরিক্ত পানের ফলে শরীরের ভারসাম্য ও সমন্বয় ক্ষমতা কমে যায়, যার কারণে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এর জেরে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও বহুগুণ তৈরি হয়। তাই হাড় ভালো রাখতে অতিরিক্ত মদ্যপান পুরোপুরি এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

৬. অত্যন্ত কড়া ডায়েট মেনে চলা
খাবারের পরিমাণ বা ধরন অতিরিক্ত মাত্রায় সীমিত করে ফেললে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং প্রোটিন-সহ হাড় ও পেশির জন্য জরুরি উপাদানগুলি পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য ডায়েট করলেও সবসময় সুষম খাবার খাওয়া জরুরি। খাদ্যতালিকা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি বাদ পড়ছে বলে মনে হলে অবশ্যই পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৭. সুস্থ বোধ করছেন বলে হাড়ের স্বাস্থ্য উপেক্ষা করা
অস্টিওপোরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেরই কোনো স্পষ্ট উপসর্গ প্রকাশ পায় না। তাই শরীরে কোনো ব্যথা নেই মানেই হাড় মজবুত রয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া বোকামি হবে। বয়স বৃদ্ধি, পরিবারে অস্টিওপোরোসিসের ইতিহাস, আগে কখনো হাড় ভাঙার ঘটনা, দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের ব্যবহার বা হরমোনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে। এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে সময়মতো হাড়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।

হাড় ভালো রাখতে আপনার করণীয় কী?
হাড়ের গুরুতর সমস্যা দেখা দেওয়ার আগেই প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সুষম খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি নিশ্চিত করা, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং উপযুক্ত শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ধূমপান বর্জন করা, অতিরিক্ত মদ্যপান বন্ধ করা এবং পেশির শক্তি ও শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু নীরবে হাড়ের ক্ষয় হতে পারে, তাই ঝুঁকির বিষয়গুলি আগেভাগেই চিনে নিয়ে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হলো সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়।